Alexa

রামগড় ট্রানজিট ধরে রাখতে মরণপণ যুদ্ধ

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও: দীপু মালাকার

ফেনী নদীর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম আর দক্ষিণে বাংলাদেশের রামগড় মহকুমা।

খাগড়াছড়ি: ফেনী নদীর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম আর দক্ষিণে বাংলাদেশের রামগড় মহকুমা।  ১৯৭১ সালের আগষ্টে বৃষ্টির পানিতে চোখ লাল হয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গেরিলা হামলা শেষ করে সাঁতরে ফেনী নদী পার হচ্ছিলেন নীলকুমার ত্রিপুরা এবং পুলিশের হাবিলদার কাশেম। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না পারায় এক পর্যায়ে নীলকুমারের রাইফেলটি পানিতে ডুবে যায়।
ফেনী নদীর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম। এই নদী পেরিয়ে রামগড়ে গেরিলা অপারেশন করে ফিরতেন মুক্তিযোদ্ধারা।
ফেনী নদীর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম। এই নদী পেরিয়ে রামগড়ে গেরিলা অপারেশন করে ফিরতেন মুক্তিযোদ্ধারা।

নিয়মানুযায়ী গেরিলাদের অপারেশনের অস্ত্র ক্যাম্পে নিয়ে ফেরত দিতে হয়। নীলকুমার দুশ্চিন্তায় পড়েন। হাবিলদার কাশেম নীলকুমারের কোমরে দড়ি বেঁধে দেন। যেন স্রোত ভাসিয়ে না নিতে পারে। ডুব দিয়ে দিয়ে পানির নিচে অস্ত্র খুঁজতে থাকেন নীলকুমার। পরে প্রায় ২০০ মিটার দূরে বালুর ভেতর অস্ত্রটি খুঁজে পান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে ফেনী নদীকে ঘিরে এ রকম শত স্মৃতি রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। এ নদী পার হয়ে সাবরুমে উঠতে পারলেই নিজেদের নিরাপদ ভাবতেন মুক্তিযোদ্ধারা। আর সাবসেক্টর বৈষ্ণবপুর থেকে হানাদার দমনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রবেশ করতেন মাতৃভূমে।

২৫ মার্চের পর থেকেই হানাদারদের ভয়ে মানুষজন চট্টগ্রাম, নাজিরহাট, ফটিকছড়ি, নারায়ণহাট ও রামগড় হয়ে সাবরুমে যাওয়া শুরু করে।
ট্রানজিট
রামগড়ের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ।

চারদিকে যুদ্ধের দামামা। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে মুক্তিযুদ্ধ। রামগড় মহকুমাও হয়ে উঠছিল উত্তাল। যে কোনো সময় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ হবে বলে মনে হচ্ছিল। ভারতের সঙ্গে রামগড় ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়াতে শহরটি নিরাপদে রাখা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

রামগড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নাম ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীরউত্তম। তিনি ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে হায়দ্রাবাদ ক্যান্টনমেন্টে ৪০ ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি পান।

১৯৭১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ছুটিতে ঢাকায় আসেন ক্যাপ্টেন কাদের। যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানে না ফিরে ২৮ মার্চ রওনা হন চট্টগ্রামের পথে। ২ এপ্রিল রাতে পৌঁছান সীমান্তশহর রামগড়ে। রাঙ্গামাটি থেকে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমামও ওইদিন রামগড় মহকুমা সদরে আসেন। প্রচুর অর্থ নিয়ে এসে রামগড় উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের লঙ্গরখানা ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তা তুলে দেন তিনি। ক্যাম্পের প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন ইপিআর সুবেদার এ.কে.এম. মফিজুল বারি (বিডিআর এর প্রথম উইং কমান্ডার) ও পুলিশের হাবিলদার কাশেম।

এর আগে ১৬ মার্চ রামগড় মহকুমার কাজী রুহুল আমিনকে আহ্বায়ক এবং সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরাকে যুগ্ম সম্পাদক করে ২১ সদস্যের একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। খাগড়াছড়ির রামগড়সহ ১ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও মং সার্কেলের রাজা মং প্রু সাইন ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আখাউড়া ও ভৈরব এলাকায় সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রামগড় উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে লঙ্গরখানায় গরুর গাড়িতে করে জবাইয়ের পশু ও খাদ্য পাঠাতেন তিনি। এছাড়াও ইপিআর-এর  বাঙালি সদস্য এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যদেরকে মানিকছড়ি এবং রামগড় প্রতিরক্ষার কাজে নিজের ৩৩টি অস্ত্র বিতরণ করেন মং প্রু।

রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইপিআর আর পুলিশের কিছু অস্ত্র নিয়ে চলছিল প্রশিক্ষণ। তবে অস্ত্র ছাড়া প্রশিক্ষণ করে কী হবে! ৪ এপ্রিল ত্রিপুরার বিএসএফ ক্যাম্পে ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় বিএসএফ-এর প্রধান ব্রিগেডিয়ার পাণ্ডের সঙ্গে বৈঠক করেন মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ ও মেজর শাফায়েতসহ বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে রামগড় আওয়ামীলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য সুলতান আহমেদ ও এইচটি ইমাম ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের আশ্বাস পাওয়া যায়।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই চট্টগ্রামের জন্যে ২ ট্রাক অস্ত্র পাঠানো হয় মহালছড়িতে। এসবের মধ্যে ছিল গ্রেনেড, মাইন ও রাইফেলের মতো হালকা অস্ত্র। কিন্তু সেখান থেকে অস্ত্র নেয়ার মতো পরিবহন ছিল না। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র পৌঁছানোর জন্যে খাগড়াছড়ির আওয়ামীলীগ নেতা নূর বক্স ৩০ থেকে ৩২ টি ‘চান্দের গাড়ি’ পাঠান। অস্ত্র হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়ায় প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়ে ওঠে আরো জোরালো।
মরণপণ
রামগড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নাম ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীরউত্তম। মহালছড়িতে প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন তিনি।

৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মহালছড়িতে হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয়। এখানেই মেজর জিয়া, মেজর শওকত, ক্যাপ্টেন কাদেরসহ নেতৃস্থানীয়রা এসে জড়ো হন। ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামের কালুরঘাটে মেজর রফিকুল ও ইপিআর বাহিনীর প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা যুদ্ধের কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বেছে নেন পার্বত্য চট্টগ্রামকে।

মিজো জনগোষ্ঠী এই পুরো সময়টাই পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতা করেছিল। তাদেরকে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী বিশেষ ব্রিগেডও গঠন করে। ২৭ এপ্রিল দুপুরে প্রায় এক হাজার মিজো এবং পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টার টিম মহালছড়ি হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করে।

মহালছড়ি রক্ষার দায়িত্ব ছিল মেজর শওকতের ওপর। তিনি নিজে হেডকোয়ার্টারের দায়িত্ব নিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের ও ফারুককে এলাকা ভাগ করে দেন। ভয়ঙ্কর যুদ্ধে এক সময় একশো মিটার কাছে চলে আসে প্রতিপক্ষের অবস্থান। ক্যাপ্টেন কাদের সাহসের সঙ্গে তার বাহিনী নিয়ে অ্যাডভান্স করেন। পাকসেনাদের চারটি এলএমজি ধ্বংস হলে তারা হয়ে পড়ে ছত্রভঙ্গ। তবে এরই মধ্যে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে আরো ৪ ট্রাক অস্ত্রে পাকিস্তানিদের  রি-ইনফোর্সমেন্ট হয়। মিজো ব্রিগেডও সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। সব হিসেব উল্টে যায়!

তবু পিছু হটেননি ক্যাপ্টেন কাদের। বাংকারে থেকেই নিজের অস্ত্র লোড করে নেন। লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন শেষ বুলেট পর্যন্ত। যখন দেখলেন পাকিস্তানি বাহিনী আরো এগিয়ে আসছে, সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে বাংকার থেকে হ্যান্ড গ্রেনেড হাতে বেরিয়ে আসেন তিনি।
যুদ্ধ
রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইপিআর আর পুলিশের কিছু অস্ত্র নিয়ে চলছিল প্রশিক্ষণ। এখানেই ছিল শরনার্থী ক্যাম্প।

একে একে ৪ টি গ্রেনেডে পাকিস্তান বাহিনীর ৪টি বাংকার বিস্ফোরিত হয়। পঞ্চম গ্রেনেড ছোড়ার সময় বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসে একটি বুলেট। লুটিয়ে পড়েন কাদের। তখনো দুই পক্ষের মধ্যে চলছে গুলি বিনিময়। এরই মধ্যে সহযোদ্ধা মেজর শওকত, ফারুক ও সিপাহি ড্রাইভার আব্বাস আহত ক্যাপ্টেনকে গাড়িতে তুলে রামগড়ের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু গুইমারায় এলে মৃত্যুর কোলে ঢলে  পড়েন ক্যাপ্টেন। বিকেলে শহীদ ক্যাপ্টেন কাদেরের মরদেহ রামগড়ে নিয়ে আসা হয়।

সাবরুমে যাওয়া এক নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বেশি প্রশিক্ষণ হয় অম্বিনগরে। ১নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয় হরিণায়। ১নং সেক্টরের অধীনে হরিণা থেকে ৩০ কি.মি. দূরবর্তী সীমান্ত এলাকা ভারতের বৈষ্ণবপুরে সাব-সেক্টর স্থাপন করা হয়।

৩০ এপ্রিল থেকেই রামগড়ে ত্রিমুখী আক্রমণ করে হানাদারেরা। এটা বোঝা যাচ্ছিল অর্ধ প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রক্ষা করা যাবে না রামগড় ও মহালছড়ি। ওইদিনই মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানী রামগড় আসেন। শরণার্থীদের ভারতে নিরাপদে স্থানান্তরের জন্যে আরো দুদিন রামগড় মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন।

করেরহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটারই ছিল পাকা রাস্তা। ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ব্যাবহার করেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে রামগড় দখল করতে বেশ বেগ পেতে হয় হানাদারদের। ৪ মে পাকিস্তানি বাহিনী রামগড় দখল করে পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল, বাজার ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মেতে ওঠে। রামগড়ের সঙ্গে ভারতের চলাচলের ব্রিজটিও ভেঙে দেয়।
রামগড়
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

রামগড় মহকুমা সদর ও রাঙামাটি দখল করার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ঘাঁটি স্থাপন করে হানাদারেরা। সেখানে তারা রাজাকার বাহিনী ও হিলরাজ বাহিনী গঠন করে।

পরে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির থেকে মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় আবারো পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে।

আগস্টের মাঝামাঝি সময়। বৈষ্ণবপুর থেকে  ফেনী নদী হয়ে ঢুকছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ দলে ছিলেন হেমরঞ্জন ত্রিপুরা, রণবীক্রম ত্রিপুরা, আবুল কালাম আজাদ, সালেহ আহমেদ ও  কালাচাঁদ প্রমুখ। নৌকায় হঠাৎই গুলি ছুড়তে শুরু করে পাকিস্তানিরা। দলটি চলে যায় পাহাড়ের ওপর রণকান্ত ত্রিপুরার বাড়ি। সেখানে দেখা যায়, জুলাইছড়ার দিকে এগিয়ে আসছে একটি পাকিস্তানী জিপ। পাহাড়ের উপর থেকে এলএমজি’তে নিশানা স্থির করে গুলি ছোড়েন কাঁলাচাঁদ। উল্টোদিক থেকেও গুলি ছোড়ে হানাদার বাহিনী। পাহাড়ে গেরিলাদের অবস্থান বোঝার আগেই প্রাণ হারায় ৫ হানাদার সেনা।

রামগড়কে শত্রুমুক্ত করতে ৭ ও ৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত হামলা চালায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী। ভারতীয় দুটি জঙ্গিবিমান রামগড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনার উপর দুই দফা সফল হামলা চালায়। অবশেষে মুক্ত হয় রামগড়।
 
যারা ঘটনা বর্ণনা করেছেন:

রামগড় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মফিজ উদ্দিন, মোহাম্মদ মোস্তফা, আব্দুল মান্নান, আবুল কালাম, মনসুর আহমেদ এবং রফিকুল ইসলাম।

বাংলাদেশ সময়: ০০০১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০১, ২০১৬
জেএম/

সহযোগিতায়:

বাগেরহাটে ৩ শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
সিঙ্গাইরে পিকআপ-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ 
আমানতের সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে পর্তুগাল, গোল করেছেন রোনালদো
পত্নীতলায় গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার