Alexa

পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: শাকিল আহমেদ, স্টাফ ফটো করেসপন্ডেন্ট

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসের পড়ন্ত বিকেল। মাঠে ধানের চারা লাগানোর জন্য জমি তৈরি করছিলেন নরেন্দ্র মারাক। শেরপুরের ঝিনাইগাতির নকশি গ্রামে তখন পাহাড়ের নীরবতা। হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ছুটে গেলেন বাড়ির দিকে।

গারো পাহাড়ের পাদদেশ: ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসের পড়ন্ত বিকেল। মাঠে ধানের চারা লাগানোর জন্য জমি তৈরি করছিলেন নরেন্দ্র মারাক। শেরপুরের ঝিনাইগাতির নকশি গ্রামে তখন পাহাড়ের নীরবতা। হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ছুটে গেলেন বাড়ির দিকে। ততক্ষণে সব শেষ। দাউদাউ করে জ্বলছে তার কাঠের দোতলা বাড়িটি। আর ধান-চালসহ যা কিছু ছিল সব নিয়ে গেছে স্থানীয় মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীরা। উপয়ান্তর না দেখে নকশীর ঠিক ওপারেই, ভারতের নোকুচি গ্রামে সপরিবারের চলে যান নরেন্দ্র। প্রায় বছর খানেক পরে ফিরে এসে আবারও বসবাস শুরু করেন। তবে দুই ছেলেকে রেখে আসেন মাসির কাছে।

শুধু নরেন্দ্র মারাক নন, সে-সময় গারো পাহাড়ের আদিবাসীদের অনেকেই এভাবে অত্যাচারিত হয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন। যাদের বেশিরভাগই আর ফেরেননি।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় থেকেই গারো পাহাড়ের আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন চলতে থাকে। সম্পত্তি দখলের জন্য মুসলিম লীগের সীমাহীন অত্যাচার, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এর পাকিস্তানি সদস্যদের নির্যাতন, অতিষ্ঠ করে তুলেছিল আদিবাসীদের। পরবর্তীকালে ১৯৬৪-৬৫ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় ভারতের বিহার, উড়িষ্যা থেকে মুসলানমানদের বিতাড়ন শুরু হলে, এখান থেকে আদিবাসীদেরও বিতাড়িত করার প্রয়াস চালান মুসলিম লীগ নেতারা। ছয় লাখের মধ্যে প্রায় দুই লাখ আদিবাসীকে দেশ ছাড়তে বাধ্যও করা হয়। তখন থেকেই স্বাধীনতাকামী হয়ে ওঠে গারো পাহাড়ের আদিবাসীরা। একাত্তরে তাই ব্যাপকভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা।

এটা তেলীখালী ব্রিজ। এখানকার যুদ্ধে গারো-হাজংরাও অংশ নেন।

বাংলাদেশের উত্তরে ভারতের সীমান্তবর্তী মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢাল এবং এর সন্নিহিত সমতল এলাকা গারো পাহাড়ের পাদদেশ নামেই পরিচিত। যা বাংলাদেশ অংশে নেত্রকোণার দুর্গাপুর-বিরিশিরি থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি হয়ে জামালাপুরের বকশিগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। মুক্তিযুদ্ধের সময় অঞ্চলটি ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন ছিল।

এ জনপদে গারো, মান্দি,হাজং কোচ, বানাই, হাদি ও ডালুসহ বেশ কয়েকটি  সম্প্রদায়ের ৬ লাখের বেশি মানুষের বসবাস ছিল। যেহেতু এসব পাহাড়ি এলাকায় গারোদের আধিক্য ছিল, তাই এ অঞ্চলকে গারো পাহাড় নামেই ডাকা হতো। গারো পাহাড়ের বাংলাদেশ অংশে সমতল ভূমি এবং কৃষি জমি বেশি থাকায় আদিবাসীদের বসবাসও ছিল বেশি।

দীর্ঘদিনের অত্যাচার, শোষণ, নিপীড়নের কারণে আগে থেকেই মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে পছন্দ করতো না আদিবাসীরা। তাদের সমর্থন ছিল আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। এ কারণে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তারা ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেন। সে সময় হালুয়াঘাট এলাকা থেকে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের মোশাররফ হোসেন আকন্দ ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রার্থী কুদরত উল্লাহ মণ্ডলকে ভোট দেন তারা।

নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি, বকশিগঞ্জ, দূর্গাপুর এবং বিরিশিরিতেও তারা আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালান। ফলে এ অঞ্চলেও নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতা না দিয়ে বরং পাকিস্তানিরা হত্যাকাণ্ড চালায়। তখন থেকেই সভা, সমাবেশে গারোসহ অন্য আদিবাসীরা সরাসরি সম্পৃক্ত হন। আর ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই শুরু হয় তাদের যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতিও।

সে সময় হালুয়াঘাট বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা প্রমোদ মানকিন ও সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রতিদিন মিটিং হতো। বাঙালিদের সঙ্গে আদিবাসীরাও তাতে অংশ নিতেন।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ শুরু হলে পাকিস্তানীদের গড়া সীমান্তের বিওপিগুলো (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) দখল করে নেয় ইপিআর এর বাঙালি জওয়ান ও আদিবাসী-বাঙালি জনতা।

এরপর এপ্রিলের শুরতেই হানাদার বাহিনী ময়মনসিংহ হয়ে এদিকে আসতে শুরু করলে আদিবাসী-বাঙালি এক হয়ে ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়ে চলে যান। মেঘালয়ের নোকুচি, নেলুয়াগিরি, খন্দকপাড়া, ডিমাপাড়া, বারাঙ্গাপাড়া, আমপাতিসহ বিভিন্ন গ্রামে প্রথমে আশ্রয় নেন তারা। সেখানে থেকে শরণার্থী শিবির। এরপর ডালুর ডিমাপাড়া, বাঘমারাসহ অন্যান্য রিক্রুটিং ক্যাম্প ও ইয়ুথ ক্যাম্পে যান। সেখানে নেতৃত্ব দেন ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান, বিরিশিরির রফিক উদ্দীন ফরাজী প্রমুখ।

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের মুক্তিযোদ্ধা ভদ্র ম্রঙ।

রিক্রুটিং ক্যাম্পে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মেঘালয়ের তোরা জেলার উত্তরাংশে রংনাবার্গ ও তেলাডালাসহ অন্যান্য ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে তাদের ২৯ দিনের গেরিলা প্রশিক্ষণ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর অমর সিং ও হাবিলদার রঞ্জিত কুমারসহ অনেকে।

গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে জুন মাসের শুরুতেই সীমান্তবর্তী ক্যাম্পগুলোতে তাদের বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে পাঠানো হয়। সেখান থেকে জামালপুরের ধানুয়া কামালপুর, শেরপুরের বারোমারী, তন্তর, বিরিশিরি, পানিহাতা, নাকুগাঁও, হালুয়াঘাটের তেলীখালী, কড়ইতলা প্রভৃতি যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত হন। এছাড়া ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার অপারেশনেও অংশ নেন তারা। প্রথম দিকে গেরিলা যুদ্ধই বেশি করতে হয়েছে।

নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সন্ত সিং বাবাজির নেতৃত্বে বড় এক সম্মুখ সমরেও অংশ নেন আদিবাসীরা। এতে হালুয়াঘাটের বাঘাইতলা গ্রামের আরেং রিছিল, মুনিকুড়া গ্রামের শহীদ পরিমল দ্রং, বকশীগঞ্জের দিগ্নিকোন গ্রামের সম্রাট দালবৎ গারো এবং দুর্গাপুরের বগাউড়া গ্রামের সুধীর হাজং, কুড়ালিয়া গ্রামের সন্তোষ চন্দ্র বিশ্বাস, চিত্তরঞ্জন ডালু প্রমুখ সম্মুখ সমরে নিহত হন।

আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা নরেন্দ্র মারাক।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের নোকুচি গ্রামে হরিমণ্ডল কোচের বাড়িতে আশ্রয় নেন নরেন্দ্র মারাক। তার সঙ্গে ছিলেন বাঙালি ইপিআর সদস্য মোহাম্মদ নূর। সেখানে ৭দিন থেকে হালচাতি গ্রামে শরণার্থী শিবিরে যান। এখানে নেতারা এসে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নাম চাইতেন। নরেন্দ্র নাম লিখিয়ে ৭দিন পর চলে যান ডালুর ইয়ূথ ক্যাম্পে। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী ট্রাকে করে তাদের নিয়ে যায় রংনাবার্গ ট্রেনিং ক্যাম্পে। এরপর তাকে আলম কোম্পানিতে অন্তর্ভূক্ত করে ৩০০ জনের একটি টিমকে পাঠানো হয় সীমান্তবর্তী এলাকা পোড়াকাইশায়। যার এপারে বাংলাদেশের তাওকোচা। প্রথম অপারেশনে জুনের শেষের দিকে তাদের পাঠানো হয় ফুলপুর কালীগঞ্জের ব্রিজ ওড়াতে। এরপর ডালু ক্যাম্পে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গেরিলা হামলা চালান তারা। ডিসেম্বরে ভারতীয় আর্মির সহায়তায় পাকবাহিনীর নকশি ক্যাম্প দখল করে তারা শেরপুরের দিকে মার্চ করেন।

ভদ্র ম্রঙ হালুয়াঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় মুক্তিযু্দ্ধে অংশ নেন। এপ্রিলের শুরুতে গ্রামের বাড়ি ধোবাউড়ার সীমান্ত পেরিয়ে মেঘালয়ের নেলওয়াগিরি গ্রামে আশ্রয় নেন। সেখানকার গারোদের আশ্রয়ে ১৫ দিন থেকে চলে যান বাঘমারা শরণার্থী শিবিরে। এখানকার রিক্রুটিং ক্যাম্পে ছিলেন বিরিশিরির আওয়ামী লীগ নেতা রফিক উদ্দীন ফরাজী। সেখান থেকে রংনাবার্গে ২৯ দিনের ট্রেনিং নিয়ে ফজলু রহমান আকঞ্জি কোম্পানির হয়ে, তারা ১৫০ জন আসেন বাঘমারা ক্যাম্পে। সেখান থেকে প্রতিরাতেই গেরিলা হামলা এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে ফাঁদে ফেলার অপারেশন করেন।

আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা প্রদীপ কুমার চিশিম।

সব মিলিয়ে গারো পাহাড়ের প্রায় দুই হাজার আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সীমান্তের ওপারে মেডিক্যাল ক্যাম্পের বেশিভাগ নার্সই ছিলেন গারো সম্প্রদায়ের। স্বাধীনতার প্রামাণ্য দলিল অনুযায়ী, শুধু হালুয়াঘাটের ২৫০ জন এফএফ(ফ্রিডম ফাইটার বা গেরিলা যোদ্ধা বা মুক্তিবাহিনীর সদস্য) এর মধ্যে ১৪১ জনই ছিলেন  আদিবাসী। এছাড়া বিএলএফ (বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স) বা মুজিব বাহিনীতেও ছিলেন হালুয়াঘাটের ১৮ জন আদিবাসী। শেরপুরেও ৭০ জন আদিবাসী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এদের মধ্যে নারী যোদ্ধাও ছিলেন। হালুয়াঘাটের জয়রামকুড়া খ্রিস্টান মিশনারী হাসপাতালের ছাত্রী থাকা অবস্থায় সন্ধ্যারানী সাংমা ও ভেরোনিকা সিমসাং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আদিবাসীদের অনেকে অবশ্য ভারতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। বর্তমানে সব মিলিয়ে দেড়, দুই লাখের মতো আদিবাসী রয়েছেন গাড়ো পাহাড়ে। বানাই, হাদি ও ডালু সম্প্রদায়ের লোক এখন আর নাই বললেই চলে। আর কোচ সম্প্রদায় তো প্রায় বিলীনই হয়ে গেছে।

যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
ঝিনাইগাতির মুক্তিযোদ্ধা নরেন্দ্র মারাক, হালুয়াঘাটের মুক্তিযোদ্ধা ভদ্র ম্রঙ, প্রদীপ কুমার চিশিম, ইলিপ সংমা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. কবিরুল ইসলাম বেগ।

সহযোগিতায়:

বাংলাদেশ সময়: ০০০৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০১, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

আবারো বিতর্কে জড়ালেন কঙ্গনা
সাত মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন, মামলা হয়নি
সুদের পাওনা টাকার জের ধরেই গৌরাঙ্গকে হত্যা করা হয়
ঈদের আগে জামিন মিললো ৪২ শিক্ষার্থীর
বাজপেয়ীর মৃত্যুতে ত্রিপুরায় মাসব্যাপী কর্মসূচি