Alexa

পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

গ্রামের নাম গয়ড়া। যশোরের সীমান্ত-উপজেলা শার্শার বেনাপোল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড। দক্ষিণে কন্যাদহ বাওড়, উত্তরে আমড়াখালি, পূর্বে লাউতাড়া আর পশ্চিমে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগণার বনগাঁ থানার জয়ন্তীপুর ও খয়রাখালি।

শার্শা, যশোর: গ্রামের নাম গয়ড়া। যশোরের সীমান্ত-উপজেলা শার্শার বেনাপোল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড। দক্ষিণে কন্যাদহ বাওড়, উত্তরে আমড়াখালি, পূর্বে লাউতাড়া আর পশ্চিমে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগণার বনগাঁ থানার জয়ন্তীপুর ও খয়রাখালি। কাগজপুর থেকে দক্ষিণে ঢোকা সড়কটিই গয়ড়ার। সীমান্ত কিলোমিটার দুয়েক দূরে।

১৯৭১ সাল। দিনটি ছিল শনিবার। এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ। উত্তরে কাগজপুর থেকে দক্ষিণে গয়ড়া পর্যন্ত রাজাকারদের ভুয়া সাম্প্রদায়িক তথ্যেই বড় সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিল সেদিন। বয়ড়া ছিল ৮ নম্বর সেক্টরের বেনাপোল সাব-সেক্টরের অধীন। সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম ও ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-ইলাহী।


গয়ড়া গ্রামের অরক্ষিত গণকবর।

কন্যাদহের দিক থেকে গয়ড়ার দিকে অগ্রসর হওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে ইপিআর, মুজাহিদ বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিক্ষিপ্ত অবস্থান ছিল গয়ড়ায়। খানসেনাদের কাছে খবর ছিল, এই গ্রামের ৩৭ ঘরের, মতান্তরে ৪৩ ঘরের, সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ম্যাপও ছিলো তাদের হাতে। মৃত রাজাকার আক্কেল মোড়লের নাম মুখে নিতে ওই গ্রামের মানুষ এখনও ভয় পায়। গ্রামবাসীর ধারণা, আক্কেল মোড়লই সেদিন এই গ্রামের মানুষদের নিশ্চিহ্ন করার সব আয়োজন করেছিলেন।


গয়ড়া গ্রামের অরক্ষিত গণকবর।

রাজাকারদের ছক অনুযায়ী সেদিন আক্রমণ শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। সম্মুখযুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন অনেকটা অপ্রস্তুত ইপিআর বাহিনীর সদস্য ও স্বল্পসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানিরা গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে সকালের দিকেই। এর আগেই কন্যদহ খালের উপরের ব্রিজটি উড়িয়ে দেয় ইপিআর বাহিনী। তাতেও রক্ষা হয় না। ইপিআরের কেউ কেউ গ্রামে ঢুকে সাধারণ মানুষের লুঙ্গি গেঞ্জি পরে গ্রামের মানুষকে পালিয়ে যেতে বলেন। তখন গুলি চলছে মুর্হুমুহু। অনেকে পালানোর সুযোগও পাননি।

এমন পালাতে-না-পারা একজন মো. কিতাব আলী ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য। সেসময় মায়ের পেটে ৪ মাস বয়সের মো.  গোলাম হোসেনের বাবা কেরামত রহমান, দুই চাচা লুৎফর রহমান ও ওসমান এবং তার ছয়মাস বয়সী শিশুসন্তান ছিলো সে তালিকায়।

গয়ড়া গ্রামের অরক্ষিত গণকবর।

পাকসেনারা যখন একেবারে ঘরের দুয়ারে, তখন তারা ঢুকে পড়ে বাড়ির উঠোনের কোণে খোড়া মর্চের (মাটিতে গর্ত করে তৈরি কাঠ, ফসলাদি রাখার জায়গা) মধ্যে। কিন্তু দাদা কিতাব তখন উঠোনে ঘুরছিলেন বল্লম হাতে নিয়ে। গুলির পাশাপাশি ঘরে আগুন দিতে দিতে খানসেনারা এসে ধরে ফেললো কিতাবকে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন বাঁচানোর জন্য, ‘খোকা আমাকে মেরে ফেললো!’।

বাবার আর্তনাদে মর্চে থেকে বেরিয়ে এলেন চারজনই। সঙ্গে সঙ্গেই তাদের উপর চললো অতর্কিত গুলি। অন্য দু’জনের সঙ্গে উসমান লুটিয়ে পড়লেন শিশুসন্তানকে নিয়ে। উসমানের সঙ্গে তার কন্যাকেও ভেদ করে গেলো গুলি। সেসময় এলাকা ছাড়লেও পরে ভাগিনা ইসলাম তরফদার এসে দেখেন লাশ পড়ে আছে। কোনো উপায় না দেখে সেই মর্চের মধ্যে সবার লাশ ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে দেন। এখন সে কবর ঘিরে ভাঙা ইটে জমা স্যাঁতলা। বকুল আর জবা সেখানে ছায়া দিচ্ছে, দিচ্ছে সুরভি আর বিছিয়ে রেখেছে পরম মমতা।

এমন গল্প এ গ্রামে দু’একটি নয়, প্রায় প্রতি ঘরে। কারও মতে, একই দিন গ্রামের ৬৩ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। পুড়িয়ে দেয় গ্রামের প্রায় সব ঘর। যুদ্ধে মারা যায় মোট দেড় শতাধিক।

কিতাবের বাড়ির ১০০ গজের মধ্যে রাস্তার পশ্চিমপাশের বাড়িটিতে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় শাশুড়ি লতিফুর, বর্তমানে ৯৫ বছর বয়সী নূর মোহাম্মদের স্ত্রী পরি, তার ছয় মাস বয়সী ছেলে, ভাইবউ আছিয়া ও সাইফুনকে। নূর দৌড়ে পালাতে পারলেও তারা পালাতে পারেননি। খানসেনারা চলে যাওয়ার পর এসে দেখেন পড়ে আছে সবার রক্তাক্ত লাশ। পরে পাশের বাড়ির মমতাজকে নিয়ে তিনি পুকুরের কোণায় তাদের কবর দেন একসঙ্গে। সেখানে এখন চিহ্ন বলতে রয়েছে একটি সৃষ্টিফুল আর কতগুলো মানকচুর গাছ।

একইভাবে আবদুল গফুর, আক্কাস আলী, আবেদ খতিব ও ময়েজ উদ্দিনকে একসঙ্গে মেরে ফেলা হয়। তাদের কবরের চিহ্নটুকুও আজ আর নেই। তবে জায়গাটি চিহ্নিত। বর্তমানে অবস্থান বাবর আলীর বাড়ির প্রাচীরের কোণায়।

বাপ-ছেলেকে একসঙ্গে মেরে ফেলার রেকর্ডও পাওয়া গেলো কয়েকটি ঘরে গিয়ে। এর মধ্যে রহমান-পাঁচু মোড়ল, উদ্দীন-মোসলেম, ইনসাফ আলী-হামেদ আলীর নাম উল্লেখযোগ্য।

যার ইন্ধনে ‘মালাউন পাড়া’ বলে এ বর্বর হামলা চালানো হয় সে ব্যক্তিটির নাম আক্কেল মোড়ল বলেই জানেন সবাই। তবে এখন তার নাম মুখে নিতে চান না কেউ। পাছে জীবন দিতে হয়! কারণ তার বংশধরেরা এখন বেশ দাপুটে।

বেনাপোল সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরের কাগজপুর মোড় থেকে দক্ষিণে মোড় নিলেই গয়ড়া। যুদ্ধের সময় এ গ্রামের মানুষদের কেউ পার হয়ে চলে যায় ওপারের বনগাঁ, কেউ ইছামতির তীরের রুদ্রপুরে নেন আশ্রয়। সেদিন পাকিস্তানিরা শুধু একটি মসজিদ দেখে থামিয়েছিল নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ। এক মাওলানাকে দেখে তারা বলেছিলো, ‘আপ মুসলিম হু, ঝুট বলরাহাহু, ইয়ে তো মালাউন পাড়া হে ’’।

পরে তার হাতে কোরআন দেখে বিশ্বাস করে থামায় হত্যাযজ্ঞ। ততক্ষণে ঝরে গেছে বহু প্রাণ। পারিবারিক গণকবরে ভরা এ গ্রামে নেই কোনো স্মৃতিফলক। দেশের আর কোনো গ্রামে এমন ঘটেছে কিনা তাও জানা যায় না।

গয়ড়া গ্রামের অরক্ষিত গণকবর।

বেনাপোল বর্ডার থেকে অর্ধকিলোমিটার দূরে দীঘিরপাড়েও যুদ্ধ হয় একই সময়। শার্শা সীমান্তের ওপারে কাঁঠালবাগান, গলায় দড়ি দেওয়া বাগান, চাপাবেড়ে, পাঁচ নম্বর টালিখোলা ক্যাম্পে হতো ট্রেনিং। বারাকপুর ছিল ট্রানজিট ক্যাম্প। হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হতো চাকুলিয়ায়। এই ক্যাম্পগুলোতে যোদ্ধাদের পাঠানো হতো বিভিন্ন অপারেশন পয়েন্ট রেকি করতে। অপেক্ষাকৃত শিক্ষিতদের পাঠানো হতো স্পটে। যেন তারা এসে একটি নকশা বা ছক আঁকতে পারে। জনসাধারণের সঙ্গে মিশে পাকসেনাদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা হতো।

আমড়াখালি, দীঘিরপাড়, নিজামপুর, নারায়ণপুরেও হয় সম্মুখযুদ্ধ। আর সীমান্তের এসব ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা এসে যুদ্ধ করতো এ অঞ্চলে। সীমান্তের ওপার থেকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিতো ভারতীয় বাহিনী।

অম্লান স্মৃতির আমড়াখালি মাটির বাংকার গয়ড়ার এ-বাড়ি সে-বাড়ি পেরিয়ে গ্রামের পিছনের ফাঁকা জায়গাটি বিল। চারদিকে হেমন্তের ধানের মিষ্টি গন্ধ। ধান কাটা চলছে। কোনো ধানের মধ্যে এখনও দুধচাল। গয়ড়া শেষ হতেই পুবে দূরে গাছঘেরা যে গ্রামটি দেখা যায়, সেটি লাউতাড়া গ্রাম। উত্তরে আমড়াখালি বিল। দক্ষিণে কন্যাদহ হাওর। এই আমড়াখালি বিলের প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়েই ছিল পাকিস্তানি সেনাদের বাংকার। বিলের মাটি খুঁড়ে পরিখা খনন করে বানানো উঁচু চালা ঢিবিই বাংকার। তাদের নিরাপত্তা চৌকি। মুক্তিসেনা ও মিত্র বাহিনীকে আক্রমণ করতে এই বাংকার করে তারা।

বিলের মাঝখানে উঁচু মাটির ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে থাকা খেঁজুর গাছের স্থানটিই ছিলো বাংকার।

এই বাংকারগুলো থেকে খয়রামারি, গয়ড়ার দিকে গোলা, মর্টার শেল ছুড়তো পাকিস্তানিরা। এর প্রায় দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে গয়ড়ায় মুক্তিফৌজের কয়েকটি ব্যাংকার ছিলো বলেও জানা যায়। তবে সেগুলোর কোনো চিহ্ন কেউ রাখেনি। পাকিস্তানিরা বাংকার ছেড়ে কখনও বের হলে গেরিলা যোদ্ধারা তাদের বাংকার থেকে আক্রমণ করে মেরেছে অনেক খানসেনাকে।

ধানের আইলের নরম মাটির উপর দিয়ে মিনিট ২০ হেঁটে পাওয়া গেল বিলের মাঝের একটি উঁচু ঢিবি। ঢিবির নিচে যে ধান জন্মেছে সেটি বেশ নিচু জমি। এখানে যে পরিখা ছিল সেটা স্পষ্ট। দুটি খেজুরগাছও জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। ধনী কোরবান মেম্বারের জমি হওয়ায় তিনি অতোটা প্রয়োজনবোধ করেননি সংরক্ষণের। ঘুরতে ঘুরতে মাঠেই পাওয়া গেল লাউতাড়া গ্রামের চাষি আবুল কালামের। তিনি দেড় টাকা হাজিরায় এই বাংকারে ইট বয়ে নেওয়ার কাজ করেছেন। ১০-১২ বছর বয়স হলেও তিনি এ এলাকায় এসেছেন সেসময়। জানালেন পাকিস্তানিরাই করেছিল বাংকারগুলো। এখান থেকে গয়ড়া, খয়রামারিতে আক্রমণ চালাতো তারা।

বিলের মাঝখানে উঁচু মাটির ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে থাকা খেঁজুর গাছের স্থানটিই ছিলো বাংকার।

ভারতীয় সীমান্ত ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তাই সেদিকে তাক করেই বানানো হয় বাংকারগুলো। উত্তরে আমড়াখালি (বর্তমান বিজিবি ক্যাম্প ও ট্রেন ব্রিজ) পর্যন্ত ছিল তাদের বিস্তৃতি। সেদিকে তাকিয়ে দেখা গেল বিলের মাঝে আরও দুটি উঁচু ঢিবি। সেখানে পাওয়া গেল ঢিবি, মানে বাংকারটির জমির এক দাবিদারকে।
 
সেনারা যখন বাংকার ছেড়ে চলে যায় তখন তারা অনেক মাইন পেতে রেখে যায়। স্বাধীনতার পরপরই মাইনগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হয় নিরাপত্তার জন্য। যারা পরিশ্রম করতে পেরেছে তারা বাংকারগুলো সমান করে ফেলেছে। যারা পারেনি তারা করেনি।

সীমান্ত ও কাছাকাছি পাকা রাস্তা থাকায় সহজেই পাকিস্তানি সেনারা এসব স্থানে আস্তানা গাড়ে। তারা জানতো ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা বেশি। একইসঙ্গে বড় সাপোর্ট আছে ভারতের।

এই বাংকার থেকেই তারা আশপাশের এলাকায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় বলে জানান স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা। আর বাংকারে থাকায় তারা পরিখা ধরে হাঁটা-চলা করলেও দূর থেকে দেখা যেতো না। আবার গোলা পড়লেও মাটির ঢিবি তাদের বাঁচিয়ে দিতো।

****তথ্য দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কওছার আলী, শহীদুল্লাহ, মো. আবুল কালাম, স্থানীয় নূর আলী, জামাল হোসেন, সাইফুল তরফদার ও সুফিয়া।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন:
**মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার

বাংলাদেশ সময়: ০০০১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৬
এএ/জেএম

বাগেরহাটে ৩ শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
সিঙ্গাইরে পিকআপ-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ 
আমানতের সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে পর্তুগাল, গোল করেছেন রোনালদো
পত্নীতলায় গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার