Alexa

পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর যুদ্ধের দামামা বাজতেই বশির আহমেদ চলে যান ভারতের বেতাই। যোগ দেন ইয়ুথ ক্যাম্পে। যুদ্ধে যেতে হবে, তাই নিচ্ছেন প্রস্তুতি। ক্যাম্পে থাকতে থাকতেই বেঁধে যায় যুদ্ধ। সেসময় অন্যরকম একটি পরিকল্পনা করলেন তিনি।

মেহেরপুর: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর যুদ্ধের দামামা বাজতেই বশির আহমেদ চলে যান ভারতের বেতাই। যোগ দেন ইয়ুথ ক্যাম্পে। যুদ্ধে যেতে হবে, তাই নিচ্ছেন প্রস্তুতি। ক্যাম্পে থাকতে থাকতেই বেঁধে যায় যুদ্ধ। সেসময় অন্যরকম একটি পরিকল্পনা করলেন তিনি। বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার যুদ্ধক্ষেত্র পলাশী ছিল কাছেই। সিদ্ধান্ত নিলেন সেই পলাশীর প্রান্তরটা একবার দেখে যুদ্ধের একটি ভৌগোলিক জ্ঞান অর্জন করার। দুশমনরা কোন দিক দিয়ে কোন নদী ধরে আসতো, সিরাজ-উদ-দৌলা কোথায় থেকে যুদ্ধ করেছিলেন এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা নিলেন ক্যাম্প থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়ে।  

 

পলাশী থেকে ক্যাম্পে ফিরে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য গেলেন বিহারের চাকুলিয়ায়। তিনি ছিলেন প্রথম ব্যাচে। দলের অন্যরা সেখানে ২৮ দিনের ট্রেনিং করলেও বশির ট্রেনিং করেন দুই মাস। প্রথম ব্যাচে গিয়ে শেষের একমাস তিনি গেরিলা হাবিলদারি ট্রেনিং নেন। এই ট্রেনিং বিশেষ কিছু যোদ্ধাকেই দেওয়া হয়। অতিরিক্ত একমাসে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সম্পর্কে আরও শেখানো হয়। প্রধানত কীভাবে ধৈর্য আরও বাড়াতে হবে, যতবড় দুশমন হোক নারী ও শিশুদের মারা যাবে না----এসব। এছাড়া বিভিন্ন উপদেশ দেওয়া হতো। সেগুলো কাজে লাগানো হতো যুদ্ধক্ষেত্রে।
 
ট্রেনিং শেষে চলে যান নদীয়ার শিকারপুর। এপারে মেহেরপুরের গাংনীর কাজিপুর।

 

তৌফিক-ই-ইলাহী তখন মেহেরপুরের এসডিও। পাশাপাশি সাব-সেক্টরের দায়িত্বও পালন করতেন। বশির আহমেদ ছিলেন ৩২ জনের একটি গেরিলা ইউনিটের কমান্ডার। এখনও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তিনি।

তৌফিক-ই-ইলাহী একবার বশিরকে বলেন পীর সাজতে। যেতে হবে কাজিপুর সীমান্তে রেকি করতে। আর তিনি নিজে সাজেন মুরিদ। লম্বা জোব্বা, টুপি পরে তারা রেকি করতে যান পাঞ্জাবিদের চলার একটি পথ। এটা ছিল একেবারে সীমান্ত এলাকা। ওপারে ভারতের নদীয়ার শিকারপুর, এপারে গাংনীর কাজিপুর।
ইলাহী তার সাহাবি হলেন। কখনও বশিরের জুতা হাতে নিতেন, হাত ধরে হাঁটতেন। যাত্রা শুরু করে শিকারপুরে একটি সাঁকো পার হলেন। সাঁকো পার হয়ে দেখেন ছোট একটি মসজিদ। তখন মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। নামাজ পড়তে গিয়ে দেখেন মসজিদে লোক মাত্র পাঁচজন। পীর সাহেব বললেন,‘ বাবা তৌফিক-ই-ইলাহী একজনকে নামাজ পড়াতে বলো।’ কিন্তু উপস্থিত অন্যরা বলেন হুজুর যখন আছেন তখন তিনিই পড়াবেন। সে অনুযায়ী নামাজ পড়ালেন বশির। ততক্ষণে এলাকায় চাউর হয়ে যায় মসজিদে একজন পীর এসেছেন। কিন্তু নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে দেখেন বাইরে শিশু, বৃদ্ধ মিলে প্রায় আড়াইশো লোক। সব বোতল, গ্লাস হাতে নিয়ে পানিপড়া নিতে এসেছেন। হুজুরের কাছে ফুঁ দিয়ে নিলে বিপদ দূর হয়ে যাবে।
ইলাহী তখন বললেন, ‘হুজুর বহু লোক এসেছে, সব বিপদগ্রস্ত একটু ফুঁ দিয়ে দেন।’

তখন ‘পীর’ বশির বললেন, ‘বাবা ইলাহী এতোগুলো লোকের পানিতে যদি এক এক করে ফুঁ দিতে হয় তাহলে তো সকাল হয়ে যাবে। তার চেয়ে বলো তারা যেন যার যার নিয়ত করে নেন, বোতলগুলো সবাই মাটিতে রাখেন, আমি ফুঁ দিয়ে দিচ্ছি।’

এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না বশির আহমেদ। তখন আল্লাকে সাক্ষী রেখে সুরা ফাতিহা, ইখলাস পড়ে ফুঁ দিলেন মসজিদে বসেই। পরে ইলাহী আবার বলে দিলেন, যার যা বিপদ সব কেটে যাবে। কিন্তু সবাই দান করবেন। এটা হুজুরের নির্দেশ। ফুঁ শেষে মসজিদ থেকে নিচে নামার সময় ইলাহী জুতোজোড়া আবার এনে পায়ে পরিয়ে দিলেন।

এমন সময় এক হিন্দু ছেলে এসে পা জড়িয়ে ধরলো। তখন ইলাহী বললেন, ‘হুজুর অসুস্থ তার পা ধরতে হবে না, কি সমস্যা আমাকে বলো।’
সে তখন বললো, ‘বাবা আমার স্ত্রীর তিনদিন ধরে প্রসব বেদনা। কিন্তু ডেলিভারি হচ্ছে না।’
তখন তার বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। যেতে যেতে ইলাহী কানে কানে বললেন, এখানে তো যা হোক ফুঁ দিয়ে পার পাওয়া গেল। ওখানে গিয়ে কি করবি।
‘একটু একা হলেই তখন ইলাহী আমার স্যার’—বলছিলেন বশির আহমেদ।

সেই বাড়ি গিয়ে ছেলেটিকে বলা হলো একটি পবিত্র জায়গা থেকে তিনটি মাটির ঢেলা আনতে। এক জায়গায় বসে তাতে ফুঁ দিলেন ‘পীর’ বশির। তার বাবার শেখানো বিপদ আপদের একটি দোয়া পড়ে দেন তিনি। তারপর উত্তর দিকে মুখ করে ছুড়ে দিতে বলতেই কীভাবে যেনো ঘর থেকে বাচ্চা ট্যাঁ ট্যাঁ করে উঠল। তখন পীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। ইলাহী সাহেব বললেন, ‘তোমার গুরুত্ব তো আরও বেড়ে গেলো।’
রেকির মূল উদ্দেশ্য ছিল একেবারে সীমান্ত ঘেঁষে থাকা ওই মাথাভাঙা নদীর উপরের সাঁকোটি দেখা। কারণ ওই সাঁকো দিয়ে চলাচল করতো পাকিস্তানিরা। আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর ছিল, সাঁকোর কাছের ধর্মদা মাঠের পাশের একটি গাছের কাছে থ্রি-ইঞ্চ মর্টার সেট করছে পাকিস্তানিরা। তারা কি অবস্থায় থাকতে পারে, মুক্তিবাহিনী কোন দিকে থেকে আক্রমণ করলে সফল হবে-- এসব যাচাই করতেই রেকি করতে যান তৌফিক-ই-ইলাহী ও বশির আহমেদ।

রেকি শেষে যোদ্ধাদের আক্রমণের ছক এঁটে দেন তারা। পরের দিন সাঁকোর কাছে যায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর প্রায় ৩শ সদস্য। ওখানে একটি অ্যারোহেড ছিলো। সেখানে ট্রেঞ্চ কেটে পজিশন নেয় বেশ বড় একটি দল। এরই মধ্যে পাকিস্তানিরাও একেবারে শিকারপুর সীমান্তঘেঁষা কাজিপুরের ধর্মদা মাঠের কাছে অ্যাম্বুশ নেয়। তারা আসে প্রাগপুর থেকে।

মুক্তিবাহিনী জঙ্গলঘেরা গ্রামগুলোর সীমান্ত ঘেঁষেও অবস্থান নেয়। ভারতীয় বাহিনীর একটি দল আর্টিলারি শেল ছোড়া শুরু করতেই অগ্রসর হয় মুক্তিবাহিনী। এক পর্যায়ে ধর্মদার একটি আখ ক্ষেতে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানিরা। পরে চারদিক দিয়ে ঘিরে ক্ষেতের মধ্যেই আক্রমণ চালানো হয়। মারা পড়ে ৩৫-৪০ জন পাকসেনা। তিনজনকে ধরা হয় জীবিত।
অ্যাটাকে তিনজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। এই যুদ্ধের পর পাকিস্তানিরা ওই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
 
সহযোগিতায়:

ঘটনার বর্ণনা করেছেন:
মেহেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বশির আহমেদ ও শিকারপুর যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলাম।

আরও পড়ুন:
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
**মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার

বাংলাদেশ সময়: ০৭৫৮ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৬
এএ/জেএম/

পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানবাহনের দীর্ঘলাইন
কারাগারে ঈদ উৎসবে মেতে থাকবে ১০ হাজার বন্দী
ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন করমজল
কনার ঈদ গানের ডানায়
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু