Alexa

শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো ভৌতিক কলেরা মিথ

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

নয় বছর বয়স তখন তার। নাম জুলমত আলী ঝিলা। যুদ্ধের ডামাডোলে নিজগ্রাম বালুঘাট-শালিকা থেকে পাড়ি জমালেন পাশের নাটনা মাঠে।সেখানে সুতানটি শরণার্থী ক্যাম্প।

মেহেরপুর: নয় বছর বয়স তখন তার। নাম জুলমত আলী ঝিলা। যুদ্ধের ডামাডোলে নিজগ্রাম বালুঘাট-শালিকা থেকে পাড়ি জমালেন পাশের নাটনা মাঠে। সেখানে সুতানটি শরণার্থী ক্যাম্প। মাঝে ভৈরব নদের ছোট একটি শাখা বালুরখাল। খালপাড়ের পশ্চিমপাশ থেকেই ভারতের নাটনা। নদীয়া জেলার তেহট্টার নবীনগর,ছাটনি, গরিবপুর পশ্চিমের সীমান্তজুড়ে।

দিগন্তবিস্তৃত মাঠ পেরিয়ে খাল পেরুলেই নিরাপদ। তাই কয়েক হাজার শরণার্থী যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই নাটনা গিয়ে ঘর-আস্তানা গাড়তে শুরু করে। মেহেরপুর সদর থেকে নাটনার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। আর শালিকা থেকে নাটনার ৩ কিলোমিটার সড়ক এই ৪৫ বছরে কাদামাটির স্তর বাড়িয়েছে শুধু।


নাটনা সীমান্তে দাঁড়িয়ে জুলমত আলী দেখাচ্ছেন শরণার্থী ক্যাম্পের সেই জায়গা।

জুলমত আলীর সঙ্গে দেখা সেখানেই। তখন গরু চরাতেন। আর এখন সেই মাঠে,সেই খালের পাড়ে করেন কৃষিকাজ। ভরসন্ধ্যায় ৩শ গজ দূরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হলুদ সার্চলাইটের পোস্টগুলো। খালের পাড়ে ঠিক ১১৪ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের কাছের বকুলতলায় একা ঘুমান মুক্তিযোদ্ধা জাফর আলী শেখ। প্রথমে শেওড়া, পরে পাকুড়, এখন বকুলগাছ তার কবর ঘিরে। আর বসেছে একটি সাইনবোর্ডও। তফাত এটুকুই।  ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন যুদ্ধ করতে করতেই শহীদ হন তিনি।

স্মৃতি তার এখনও জ্বলজ্বলে। স্মৃতিকাতর ঝিলা কথা বলতে বলতে ধান, গমখেতের কর্দমাক্ত আলপথ ধরে হেঁটে নিয়ে গেলেন সেখানে। গলায় আবেগ, অনেকদিনের জমানো কথা।


শহীদ জাফর আলী শেখের কবর।

ঠিক নাটনা সীমান্ত ঘেঁষে ছিল মুক্তিবাহিনীর একটি ক্যাম্প। খালের পাড়ে ছিল বাংকার ও একটি কুঁড়েঘর। ওই ঘরে বসে ভারত থেকে দেওয়া চাল বাছার কাজ করছিলেন জাফর। ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় অস্ত্র থাকতো হাতের কাছেই। কিন্তু অসাবধানতায় অস্ত্রের ট্রিগারে হাত পড়ে যায়। নিজের অস্ত্রেই প্রাণ হারান তিনি। পরে তাকে সমাধিস্থ করা হয় এ সীমান্তে।

যুদ্ধ যতো গড়াতে থাকে, ততোই বাড়তে থাকে শরণার্থীদের চাপ। সেসময় পানিও বাড়তে থাকলো এ এলাকায়। কাদাপানিতে বাড়তে থাকে সীমাহীন কষ্ট। ভারতীয় রিলিফ আসতে থাকে নৌকায় করে। আটদিন পর একবার করে আসতো। তাতে থাকতো চাল,ডাল, আলু ও চকলেট। শেষে গমও দেওয়া হতো। কিন্তু বিপত্তি বাঁধালো কলেরা। সে এক অন্যরকম কলেরা। হলেই শয়ে শয়ে লোক মারা যেতো।


একেবারে সীমান্তের জিরোপয়েন্টে এ বকুল গাছের নিচেই শায়িত জাফর আলী।

এক তাঁবুর নিচে গাদাগাদি করে থাকা, মশা, চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে থাকতে শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো এক ভৌতিক মিথ। রিলিফে পর্যাপ্ত খাবার পেলেও সে খাবার সহ্য হতো না বেশিরভাগ মানুষের। সমস্যা হতো হজমের। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সব মিলে নানান কারণে দেখা দিতো প্রাণঘাতী কলেরা। আর একবার দেখা দিলে মরতো শয়ে শয়ে।

চারপাশে করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একসময় শরণার্থী শিবিরের মানুষ হঠাৎ করে দেখতো কেউ একজন মানুষ থেকে গরু হয়ে গেছে। আবার কখনও দেখতো মানুষ থেকে ছাগল হয়ে গেল; আবার হঠাৎ উধাও হয়ে গেলো চোখের নিমিষে। এসব যারা দেখতো তারা আক্রান্ত হতো কলেরায়। মূলত সুন্দর-দেখতে ও যুবা বয়সের  ছেলেমেয়েদেরই ভয় দেখিয়ে মারতো বলেই মত শিবিরে দিনকাটানো মানুষের।

ভৈরব নদের শাখা বালুখাল। খালের ওপার থেকেই ভারতের নাটনা। দূরে জ্বলছে সীমান্ত বাতি।

সীমান্তঘেঁষা নাটনা সুতানটি শরণার্থী শিবিরে এমন ভৌতিক অবস্থার মুখোমুখি হয়ে প্রাণ হারান অসংখ্য মানুষ।

ঝিলার মা ফাতেমাও মারা যান এমন অদ্ভুত কলেরায়। বমিও হতো। তার ভাষ্য,এভাবে আরও মারা যান শালিখার জয় হালসানার বউ জমিরন, মহিউদ্দিনের স্ত্রী আরশা। শেষে সবাই বলা শুরু করলো ওই ক্যাম্পে গেলে মরবি সব।

এই শিবিরে শরণার্থীদের খোঁজ নিতে তেমন কেউই আসতো না। শুধু ভারতের নবীনগরের জমিরউদ্দিন নামে একজন আসতেন। তিনি খুব খোঁজ নিতেন। রেশন কার্ড করে দিতেন। কার্ড ছাড়া কোনোভাবেই খাবার পাওয়া সম্ভব ছিলো না। অনেক সময় আবার কার্ড থাকলেও বসে থাকতে হতো শনাক্তকরণের জন্য। এমনও হয়েছে, সকাল থেকে বসে থাকতে থাকতে সন্ধ্যায় এসে খাবার মিলেছে।

সব কষ্ট, সব আতঙ্ক, সব অনিশ্চয়তার মধ্যে এই কলেরা আতঙ্কই বড় হয়ে উঠেছিল সুতানটি শরণার্থী শিবিরে।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন:
 

** পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
**মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার

বাংলাদেশ সময়: ২২০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৬

এএজেএম/

আমানতের সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে পর্তুগাল, গোল করেছেন রোনালদো
পত্নীতলায় গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
মেহেরপুরে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার
‘বেস্ট নেভার রেস্ট’ স্লোগানে ঘাম ঝরাচ্ছে জার্মানরা