Alexa

ডাউকি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বারংবার হামলা

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও দীপু মালাকার- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ভারতের শিলংয়ের পথে সিলেট থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরের সীমান্ত জাফলংয়ের তামাবিল। তামাবিল পেরিয়ে ভারতে ঢুকলেই ডাউকি। সীমান্ত পার হয়ে উত্তরে এগিয়ে বড় দুটি পাহাড় পেরোলেই ডাউকি সাব সেক্টর কমান্ডের কার্যালয়।

তামাবিল সীমান্ত: ভারতের শিলংয়ের পথে সিলেট থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরের সীমান্ত জাফলংয়ের তামাবিল। তামাবিল পেরিয়ে ভারতে ঢুকলেই ডাউকি। সীমান্ত পার হয়ে উত্তরে এগিয়ে বড় দুটি পাহাড় পেরোলেই ডাউকি সাব সেক্টর কমান্ডের কার্যালয়। আর এটা ছিল সেক্টর ৫ এর সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। মে মাসের শেষ দিক থেকে এই ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের।

অন্যান্য ক্যাম্প থেকেও প্রশিক্ষণ শেষে এখানে এসে যোগ দিতেন মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালিত হয় এখান থেকে।  

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার কথা দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইপিআর ক্যাম্পগুলোতে আগেই তথ্য পৌঁছে যায়। তামাবিলের ইপিআর ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলো পাকিস্তানি সুবেদার গুল খান। এই ক্যাম্পে অবাঙালি ইপিআর সদস্যরা কয়েকজন বাঙালি সদস্যকে হত্যা করে। ২৬ মার্চ তারিখেই সীমান্ত পেরিয়ে ডাউকিতে অবস্থান নেন বাংলাদেশি ইপিআর সদস্যরা। ইপিআর ক্যাম্প চলে যায় পাকিস্তানিদের হাতে।

তামাবিল পেরোলেই ডাউকি। এখান থেকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করে গেরিলা হামলা চালাতো মুক্তিযোদ্ধারা।

জাফলং ও আশপাশের আরো কিছু ইপিআর ক্যাম্প থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ সদস্য এসে জড়ো হন ডাউকিতে।

দুই দেশের মধ্যে ট্রানজিট হওয়াতে এই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ সচেষ্ট ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীও। ডাউকিতে ভারতীয় ক্যাপ্টেন রাউসের তত্ত্বাবধানে তামাবিলের ইপিআর ক্যাম্প পুনরুদ্ধাদেরর পরিকল্পনা নেয়া হয়। তামাবিলে পাকিস্তানিদের অবস্থান জানার জন্যে মুসলিমনগরের এক চিকিৎসককে রেকি করার দায়িত্ব দেয়া হয়।
 
ডাউকিতে পাহাড়ের উপরে ছিল বিএসএফ ক্যম্প। ডাউকি থেকে জাফলংয়ে অবস্থিত ওই পাকিস্তানি ঘাঁটির দূরত্ব প্রায় আধ মাইল। ফাঁড়িটি আক্রমণের জন্যে ৩৩ জনের দল করা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন ইপিআর সুবেদার মোশাররফ হোসেন। সঙ্গে ছিলেন ইপিআর সদস্য গোলাম হোসেন, হাবিলদার মোশাররফ আলী, আবদুল গনি, মুজিবুর রহমান, খুরশিদ আলম ও  হারিস আলী প্রমুখ।তামাবিলের ভেতরে ইপিআর ক্যম্প দখল করেছিল পাঞ্জাবি ইপিআর সদস্যরা।
৩০ মার্চ রাতে ডাউকি বাজার থেকে ডাউকি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের তত্ত্বাবধায়ক ভারতীয় ক্যাপ্টেন রাও এবং সহকারী গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে পরিকল্পনা সাজান। রাতে বাল্লাঘাট নদী পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিবাহিনী। ভোর রাতেই ইপিআর ক্যাম্পে আঘাত হানে মুক্তিবাহিনী। শুরু হয় দু’পক্ষের গোলাগুলি। একসময় পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানিরা। গুল খান ক্যাম্পে একা আটকা পড়ে গেলে মুক্তিবাহিনী জীবিত অবস্থায় পাকড়াও করে তাকে। ক্যাম্প থেকে বেশ কিছু অস্ত্রসহ গুল খানকে ধরে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের অনেকেই পালিয়ে চলে যায় ধর্মপাশায়। জাফলং বাজার মুক্ত করে মুক্তিবাহিনী।

এরপর থেকে তামাবিল বর্ডার যুদ্ধের পুরোটা সময়ই মুক্তাঞ্চল ছিল। এখানে মিত্রবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি থাকায় কখনোই সুবিধা করতে পারেনি পাকিস্তানি বাহিনী। তারা বেশ ক’বার রাজাকারদের সহায়তায় তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে চাইলেও ডাউকি থেকে মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে টিকতে পারেনি।
পাহাড়ঘেরা স্থান ডাউকি। পাহাড় থেকে অসংখ্য পাথর এসে নেমেছে বাল্লাঘাট নদীতে। এই নদী ডাউকি বাজারের পাশ ঘুরে জাফলংয়ে প্রবেশ করেছে। বাল্লাঘাট নদী ধরেই অনেক যুদ্ধে অংশ নেয় মুক্তিযোদ্ধারা।

৩১ মার্চ পর্যন্ত ডাউকিতে কয়েক হাজার শরণার্থী পৌঁছে যায়। প্রতিদিনই বাড়তে থাকে শরণার্থীর সংখ্যা। তবে থাকা গেলেও খাবারের কোনও ব্যবস্থা হয়নি তখনো। সঙ্গে নেয়া শুকনো খাবারই ছিল সম্বল। তাই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতে থাকে।

সিলেট অঞ্চলে যুদ্ধের শুরু থেকেই নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন মেজর মুত্তালিব। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যুদ্ধের শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ডাউকিতে খাদ্যের সংকট মেটাতে নিজেই বের হয়ে পড়েন মুত্তালিব।

সঙ্গীদের নিয়ে বিভিন্ন দোকান থেকে চেয়ে চেয়ে খাদ্য জোগাড় করতে শুরু করেন তিনি। যেখানে অনুরোধে কাজ হতো না, সেখানে জোর প্রয়োগ করতেন।
তামাবিলে শহীদদের গণকবর।
৪ এপ্রিল খাবার জোগাড় করতে ৩০ জন ইপিআর সদস্যকে নিয়ে ক্যাপ্টেন মোত্তালিব দরবস্ত খাদ্যগুদামে হানা দেন। মুক্তিবাহিনী আসার খবর পেয়ে চাবি নিয়ে পালিয়ে যায় গুদামের পাহারাদার। এদিতে গুদাম ঘিরে রাখে কয়েকশো লোক। তারা গুদামের চাল নিতে দেবে না। ক্যাপ্টেন মোত্তালিব প্রথমে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। ভারতে শরণার্থী ক্যাম্পের দূর্ভোগ তুলে ধরেন। এতেও জনতা মেনে না নেওয়ায় কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। ভয় পেয়ে সরে যায় মানুষ। তখন পাহারাদারাকে খুঁজে বের করে আনা হয়। বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে চাবি নেওয়া হয়। পরে ট্রাকে করে ৩ ট্রিপে ৯ বস্তা চাল নিয়ে আসা হয় গুদাম থেকে।

এরই মধ্যে ডাউকি ক্যাম্প হয়ে ওঠে ৫ নং সেক্টরের কেন্দ্রবিন্দু। শিলং এবং আসামের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ শেষে এখানে এসে যোগ দিতে থাকেন। তাদের বিভিন্ন সাবসেক্টরে ভাগও করে দেওয়া হয় এখান থেকে। সিলেট, জৈন্তাপুর, ছাতক, বাঁশতলাকে নিয়ে গঠিত হয় ৫ নং সেক্টর। এখানে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োজিত হন মেজর মীর শওকত আলী।

ডাউকি থেকে সফল একটি অপারেশন ছিল সারি নদীর ওপরের ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়ার। মেজর মুত্তালিবের নেতৃত্বে একটি দল রাত গভীর হওয়ার আগেই নৌকায় উঠে পড়েন। এরপর বাল্লাঘাট নদী হয়ে সারি নদীতে।

জৈন্তাপুর আর তামাবিলের পথে এই ব্রিজটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা ভেঙ্গে দিলেই সিলেটের সঙ্গে জাফলং এবং তামাবিলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুই পাড়েই ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প আর ব্রিজটি দিয়ে ঘন ঘন পাকিস্তানিদের জিপ আসা যাওয়া করতো। মাঝরাতের দিকে ব্রিজের নিচে বিস্ফোরক স্থাপন করে দ্রুত সরে যান মুক্তিযোদ্ধারা। কিছু দূর যেতেই বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ হয়। ভেঙ্গে পড়ে সারি নদীর ব্রিজটি। সফল অপারেশন শেষে ডাউকি ফিরে যান মুক্তিযোদ্ধারা।

তামাবিলে পরাজিত হয়ে ধর্মপাশায় চলে যায় পাকবাহিনী।

সীমান্তঘেঁষা জৈন্তাপুরকে উদ্ধারে ছিল ভারতীয় বাহিনীর বিশেষ আগ্রহ। ব্যবসায়িক কাজের জন্যে এই অঞ্চল ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৭ জুলাই ডাউকিতে বৈঠক করে জৈন্তাপুর উদ্ধারের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ৭ জুলাই দিবাগত শেষ রাতে ডাউকি থেকে মুক্তিবাহিনীর বড় একটি দল রওনা দেয়। তারা রাতের আঁধারে নিঃশব্দে জৈন্তাপুরে পাকিস্তানি ক্যাম্পের আশপাশে এসে অবস্থান নেয়।

শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। ভারতীয় বাহিনী ডাউকি থেকেই মর্টারের শেল নিক্ষেপ করে সহায়তা যুগিয়ে যাচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যান আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে।তাদের সাঁড়াশি আক্রমণে মারা যায় অনেক পাকসেনা। গুলি করতে করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, নেতৃত্বে মেজর মোত্তালিব। এক পর্যায়ে আহত হলেন মুত্তালিব। তাকে উদ্ধার করে ডাউকিতে মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে যায় ভারতীয় সৈন্যরা।

ডাউকিতে তখন ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনী থেকে যোগ দেয়া নিয়মিত বাহিনীর লোকদের বলা হতো ‘মুক্তি ফৌজ’ (এমএফ)। আর ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত বাহিনীকে বলা হতো ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ)। দুই দলের সংমিশ্রণেই তৈরি করা  হতো অপারেশন টিম।  

ডাউকি ক্যাম্প নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীরও ছিল আগ্রহ। তারা বুঝতে পারে এখান থেকে  মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর ক্যাম্প সরাতে না পারলে তারা নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে  পারবে না। নয়াপাঙ্গা নদীর ওপারে ছিল রাজাকার আজিরউদ্দিনের বাড়ি। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সর্ম্পকে জানিয়ে এই রাজাকার পাক হানাদারদের নিয়ে আসে। এটা গোয়াইনঘাট থানা সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা।

১৩ জুলাই ডাউকি ক্যাম্প থেকে এসে জাফলংয়ের পথে নয়াপাঙ্গা নদীর তীরে অবস্থান করছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সদস্যসহ মুক্তিযোদ্ধারা।  রাত তখন প্রায় দশটা। এ সময় আঘাত হানে পাকিস্তানি সৈন্যরা। সঙ্গে ভারী অস্ত্রশস্ত্র। সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ করে মুক্তিবাহিনী। কিন্তু এরই মধ্যে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পিছু হটে ডাউকি চলে যেতে বাধ্য হন মুক্তিযোদ্ধারা।

ডাউকি থেকেই বারবার হামলা চালায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী।

পুরো সিলেট অঞ্চলের যুদ্ধতেই এই ডাউকি ক্যাম্পের প্রভাব অপরিসীম। অনেক শরণার্থী এখানে প্রথমে অবস্খান নিয়ে পরে অন্য স্থানে বা স্বজনদের কাছে চলে যেতেন।

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী একই সঙ্গে ভয়ংকর আক্রমণ করে পর্যদুস্ত করে তোলে পাক হানাদারদের। ৬ ডিসেম্বর চারদিক থেকে সিলেটে ঢোকার পরিকল্পনা করা হয়। জকিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ছাতক থেকে রওনা করে মুক্তিবাহিনী। ডাউকি থেকে গুর্খা ব্যাটেলিয়ান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানি তামাবিল দখল করে দরবস্তের দিকে এগিয়ে যায়।

১৫ ডিসেম্বর সিলেটের খাদিমনগরে ঘটে চূড়ান্ত যুদ্ধ। গুর্খা বাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে।

সহযোগিতায়:

  আরও পড়ুন:
**জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল
** শমসেরনগরে জনতার প্রতিরোধ, কালিপুরে ক্যাম্প

** হরিদাসের বাড়ি হয়ে মাইল্লাম, ‘ভারত কত দূর?’
বাংলাদেশ সময়: ১৮৫৭ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১০, ২০১৬
এমএন/জেএম

যারা বর্ণনা করেছেন:
সিলেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সুব্রত ভট্টাচার্য, সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবু সুফিয়ান ও মুক্তিযোদ্ধা মালেক আলী পীর।

মা মরক্কান বাবা পর্তুগিজ, কার পক্ষে ছেলে?
৬ প্যাথলজিস্টের অভাবে দিনে ৩০ লাখ টাকা হাতছাড়া!
বাগেরহাটে ৩ শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
সিঙ্গাইরে পিকআপ-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ 
আমানতের সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর