Alexa

রাতে সীমান্ত পেরিয়ে কৌশল বাতলে দিতেন শিখ সেনারা

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

এম এ উসমান গণি, দেবী রঞ্জন, মাজেদ, হাফিজ, জলিলসহ এরা আট বন্ধু। এপ্রিলের এক ভোরে এরা সবাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে যান একযোগে।

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা: এম এ উসমান গণি, দেবী রঞ্জন, মাজেদ, হাফিজ, জলিলসহ এরা আট বন্ধু। এপ্রিলের এক ভোরে এরা সবাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে যান একযোগে। কালিগঞ্জ-কালিকাপুর রোড ধরে পিরোজপুর ব্রিজ হয়ে উকশো বর্ডারে গিয়ে নদী পার হয়ে যান ভারতের হিঙ্গলগঞ্জ। মাঝে ছিলো ইছামতি নদী। হিঙ্গলগঞ্জে তাদের রিসিভ করেন আতিয়ার রহমান। সেখান থেকে নিয়ে যান টাকিতে। ওখানে ছিলেন ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল

মেজর জলিল টাকিতেই বেশি থাকতেন। টাকিতে কয়েকদিন ট্রেনিং শেষে ওই বন্ধুদলকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হাসনাবাদের তকীপুরে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর শ্যামনগরের ফজলুল হক ইটেন্ডা তাদের নিয়ে যান ধলচিতা ক্যাম্পে।

শ্যামনগর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা উসমান গণি ছিলেন এই দলের অন্যতম সদস্য। শিক্ষা-দীক্ষায়ও তিনি ছিলেন অন্যদের থেকে এগিয়ে।

এই ৮জনের মধ্যে পদ্মপুকুরের চারজনসহ ছয়জনকে  পাঠানো হয় ধলচিতা ক্যাম্পে। ওই রাতে  সেখানে পৌঁছে তারা পলিথিন মুড়ি দিয়ে রাত কাটান। ওখানে দেড় মাস ধরে চলে অস্ত্র চালনা ও যুদ্ধকৌশলের ট্রেনিং। ১৭ জনকে নিয়ে ক্যাম্প শুরু হয়। সদস্য বাড়লে পরে ৩০০ জনকে ওখান থেকে পাঠানো হয় বসিরহাটের পেফা ক্যাম্পে। ভারতের ক্যাপ্টেন শেফার নেতৃত্বে ক্যাম্প চলতো। প্রচুর কাদা ছিলো সেসময় ক্যাম্পে। রাতে যেখানে তারা থাকতেন সেখানে এপাশ ওপাশ করলেই গায়ে কাদা লাগতো। এই ক্যাম্প থেকেই মূলত সংগঠিত করা হয় একটি দলকে।
ন্যূনতম মেট্রিক পাস ছিলেন  এমন ৩শ জনকে এদের মধ্যে থেকে  আলাদা করে বেছে নেওয়া হয় মেডিকেল ট্রেনিংয়ের জন্য।

জুলাই মাসের দিকে মূলত মেডিকেল ট্রেনিং দেওয়া হয়। মেডিকেল ট্রেনিং শেষ হলে আবার পাঠানো হয় কল্যাণী রেস্ট ক্যাম্পে। ওখানে রাখা হয় ৭ দিন। তারপর বাগুন্ডিয়া। ওখান থেকেই দেওয়া হয় অস্ত্র আর ওষুধ। সঙ্গে ২০০ রাউন্ড গুলি, এসএলআর, পিট-টু আর ফাস্টএইড বক্স। তারপর পাঠানো হয় হিঙ্গলগঞ্জ অপারেশন ক্যাম্পে।

এমএ ওসমান গণিদের ৩০০ জন অস্ত্র ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি প্রথম ধাপে মেডিকেল ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এদের কাজ ছিলো যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ আহত হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া। যুদ্ধক্ষেত্রে কারও হাত-পা  ভেঙে গেলে, চোট লাগলে, গুলি লাগলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা যেনো একজন কাছের মানুষের কাছ থেকে পায় সেজন্য এ ট্রেনিং দেওয়া হয়। কয়েকটি ইউনিট মিলে থাকতো একটি মেডিকেল টিম।

অন্য যোদ্ধাদের চেয়ে মেডিকেল ট্রেনিংপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের দায়িত্ব-ঝুঁকি কোনো অংশে কম ছিলো না। প্রতি রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে যেতে হতো তাদের। তারা খোঁজ নিতেন কারও কাশি, নিউমোনিয়া হচ্ছে কিনা, শরীর দুর্বল কিনা। বিশেষ করে যারা অ্যাম্বুশ করে বসে থাকতো তাদের কাছে যেতে হতো।

ট্রেনিং শেষে তাদের ফার্স্ট এইড বক্সে দেওয়া হতো কফ সিরাপ, প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ, ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিবায়োটিক পাউডার, ডেটল, ফরসেপ ইত্যাদি। নির্দেশ ছিলো, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রের সঙ্গে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে যেতে হবে। সে অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা কাছের কোনো ক্যাম্পে বক্স রেখে যুদ্ধ করতেন।
 

বাংলাদেশেরই এমবিবিএস ডাক্তাররা ওপারে গিয়ে ট্রেনিং দিতেন। এদের মধ্যে সবাই ছিলেন বয়সে তরুণ। নেতৃত্ব দিতেন একজন। তিনি ওপারে থেকেই কোন সময়ে কোন ওষুধ, কোন চিকিৎসা দিতে হবে তা বলে দিতেন। আবার ওষুধ শেষ হয়ে গেলে কার কি লাগবে সেটাও দিতেন তিনি। সাতক্ষীরার ডা. জলিল সার্বক্ষণিক ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকতেন। এছাড়া কালিগঞ্জের ডা. হজরত আলীও যেতেন ট্রেনিং করাতে। সাধারণত ১৫-৩০ দিনের ট্রেনিং হতো। ৯ নম্বর সেক্টরে শুধু ৩শ জনকেই মেডিকেল ট্রেনিং দেওয়া হয় বলে জানান উসমান।

মূল ট্রেনিং হয় উত্তর চব্বিশ পরগণার বসিরহাটের পেফা ক্যাম্পে। ভারতের স্বীকৃতি দেওয়ার আগেও রাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে যুদ্ধের কৌশল বলে দিয়ে যেতেন শিখ সেনারা। রাতে ডিরেকশন দিয়েই আবার রাত থাকতেই চলে যেতেন তারা। অস্ত্র, গোলাবারুদ, আশ্রয়, ট্রেনিংয়ের পাশপাশি সেসময় বিভিন্ন ধরনের কৌশল, নির্দেশনা সরাসরি সীমান্তের রণাঙ্গনগুলোতে দিয়ে যেতেন ভারতীয় সেনারা।  

অ্যাম্বুশ করে বসে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরের হাল হকিকতের খোঁজ, কখন কোন ওষুধ দরকার সে খোঁজ রাখা ছাড়াও  রাতে আশপাশের প্লাটুনগুলোতে গিয়েও খোঁজ-খবর নিতে হতো।
একবার মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ দিতে গিয়ে বিলের মাঝখানে পাকসেনাদের কবলে পড়েন উসমান গণি ও সাদেক। ওষুধের বক্স বহন করার জন্য সঙ্গে ছিলেন ইউনুস নামে আরেকজন যোদ্ধা। দু’জনের কাছে ছিলো শুধু স্টেনগান। বিল আড় দিয়ে যাওয়ার সময় তারা দেখতে পান নারিকেল গাছের গায়ে সাদা মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে। মনে মনে ভাবেন ইঁদুর তাড়ানোর জন্য কিছু হয়তো। এটা ছিলো কুলিয়ার শ্রীরামপুর। নভেম্বর মাসের শেষের দিকে। ওপারে শলাডাঙ্গা, ইটেন্ডা। ওষুধ দিয়ে ফেরার পথে শুরু হয় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। তখন পাল্টা ফায়ার দিয়ে রোলিং করে একটি খালে পড়ে যান তিনজনই।
দলের তিনজন যে খানসেনাদের কবলে পড়েছেন তা টের পান লে. আনোয়ার ও সোবহানের প্লাটুন। সঙ্গে সঙ্গে কভারিং ফায়ার দিয়ে তারা বাঁচিয়ে আনেন তিনজনকে।

কুলিয়া শ্রীরামপুরে বালির বস্তা, খেজুর গাছ কেটে বাংকার বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রতি সন্ধ্যায় শেলিং করতো পাকিস্তানিরা। ট্রেঞ্চ বেয়ে বাংকারে চলে আসতেন। হঠানোর শক্তি ছিলো না।

সুবেদার সোবহান সাহেবের প্লাটুনে চিকিৎসা দিতেন লে. আনোয়ার ও তাহের ।

২০ নভেম্বর হিঙ্গলগঞ্জ ক্যাম্পে খবর যায় পাকিস্তানিরা কালিগঞ্জে ক্যাম্প গোটানোর চেষ্টা করছে। তাদের আক্রমণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় করে ইছমতি পার হতে বলা হয়। সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার নেতৃত্বে একটি দল থানার পাশে পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করে তাদের হটিয়ে দেয়। তারা নদী পার হয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গিয়ে অবস্থান নেয় কুলিয়ায়। একটি রকেট লঞ্চারসহ বেশকিছু অস্ত্র ফেলে রেখে খানসেনারা পালায়। আটক করা হয় কয়েকজনকে।

পালিয়ে গিয়ে পুষ্পকাঠি, কুলিয়া, শ্রীরামপুর এলাকায় শক্ত ডিফেন্স তৈরি করে তারা। কুলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিল তাদের ক্যাম্প। রাজাকাররাও যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। টানা ১৩ দিন যুদ্ধ হয়। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল শাখরা ও  কোমরপুর সীমান্ত এলাকায়।

প্রথম দিনের যুদ্ধে সুরাত, তোয়াক্কেল, খালেককে বলা হয় আক্রমণ করতে। দুটি এলএমজি, এসএলআর, স্টেনগান ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। ৬ জন রাজাকার মারা যায় সে যুদ্ধে। স্কুলঘরের উপরে অ্যাম্বুশ করে বসে থাকা পাকিস্তানিদের ছোড়া গুলিতে মারা যান বরিশালের ছেলে ইউনুস। মুক্তিবাহিনীর সবারই সেসময় মাথায় হেলমেট থাকতো। তবু ইউনুস মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েই মারা যান। ইউনুস মারা যাওয়ার পর সুবেদার সোবহান আর তাহেরের দুই দলই তখন পিছু হটে গুলি করতে করতে সটকে পড়ে। খালেকের পিঠে ছিলো ইউনুসের লাশ। তিনি ছিলেনআর্মির নায়েক ।
অপারেশন ক্যাম্প
সীমান্তলাগোয়া হিঙ্গলগঞ্জ ক্যাম্পটিকে বলা হতো অপারেশন ক্যাম্প। এ ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ৯ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় আগে থেকে রেকি করে আসতেন। কোথায় যুদ্ধ চলার সময় অবস্থান নেওয়া যাবে, কি প্রস্তুতি প্রয়োজন, শত্রুপক্ষে কতজন আছে –এসব বিষয় তারা এ ক্যাম্পে এসে জানানোর পর যুদ্ধের জন্য দল পাঠানো হতো।
 
এখানকার দায়িত্বে ছিলেন সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা। তার অধীনে ছিলেন মাহফুজ আলম বেগ। ইনি প্রধান গেরিলা ট্রেনার হিসেবে কাজ করতেন। রহমতুল্লাহ দাদু ছিলেন নেভালের প্রধান।

১৫ আগস্ট পারুলিয়া ব্রিজটি মাহফুজ আলম বেগ নিজেই ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন পাকসেনাদের চোখে ধুলো দিয়ে। তার দুর্ধর্ষ গেরিলা ট্রেনিং ছিলো। বসন্তপুর রাজাকার ক্যাম্প থেকে সাহসের সঙ্গে রাজাকারকে ধরে আনেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের যেকজন প্ল্যানার ছিলেন তাদেরই একজন ছিলেন তিনি। তার ট্রেনিংয়েই ৯ নম্বর সেক্টর হয়ে ওঠে আরও সমৃদ্ধ।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন
** বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন: সভার আড়ালে শপথগ্রহণ
** ‘পাকিস্তান বাগান’: একাত্তরের অরক্ষিত বধ্যভূমি
** জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল
** শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো ভৌতিক কলেরা মিথ
** পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
** মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার


বাংলাদেশ সময়: ০৭৫৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১১, ২০১৬
এএ/জেএম/

গোবিন্দগঞ্জে নদীতে গোসল করতে নেমে কলেজছাত্রের মৃত্যু
মা মরক্কান বাবা পর্তুগিজ, কার পক্ষে ছেলে?
৬ প্যাথলজিস্টের অভাবে দিনে ৩০ লাখ টাকা হাতছাড়া!
বাগেরহাটে ৩ শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
সিঙ্গাইরে পিকআপ-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১