Alexa

তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি এবং ভিডিও: শাকিল আহমেদ

পাকবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। এ খবরে রৌমারীর ছাত্র-সেনা-শিক্ষক-জনতাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

রৌমারী, কুড়িগ্রাম: পাকবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। এ খবরে রৌমারীর ছাত্র-সেনা-শিক্ষক-জনতাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেখানে গড়ে তোলেন গেরিলা যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। যেখান থেকে ৬৫ হাজার গেরিলা যোদ্ধা তৈরি করা হয়। যারা বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন।

’৭০ এর নির্বাচনের সময় থেকেই এ এলাকার মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ শুরু করেন। দেশের অন্যান্য স্থানের মত এখানে তারাও গড়ে তোলেন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ। যার নেতৃত্ব দেন এমএনএ নুরুল ইসলাম পাপু মিয়া ও যাদুরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান।

সীমান্তের ওপারেই ভারতের তেলাডালা। যেখানে ছিল জেড ফোর্সের হেড কোয়ার্টার।

কুড়িগ্রাম জেলার একটি বিচ্ছিন্ন উপজেলা রৌমারী। জেলার চিলমারী উপজেলা থেকে বহ্মপুত্র নদ এ জনপদকে বিচ্ছিন্ন করেছে। যার উত্তর ও উত্তর-পূর্বে ভারতের আসাম, দক্ষিণ-পূর্বে মেঘালয়, আর দক্ষিণে জামালপুর। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ জেলা ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন হলেও রৌমারী ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন। যেখানে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশের ভেতরে গণবাহিনীর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। দেশের ভেতরে কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়া হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যসব পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে।

মার্চ মাসে রৌমারীতে ছুটিতে ছিলেন সেনাবাহিনীর সুবেদার মো. এনামুল, হাবিলদার এসএম রিয়াজুল, সিগন্যাল নায়েক এনামুল হক, পুলিশ সদস্য মাহবুব রহমান চণ্ডুল ও বিমানবাহিনীর নায়েক মৌলভী মজিবর রহমান। তারাই রৌমারী প্রশিক্ষণক্যাম্পের উদ্যোক্তা এবং প্রশিক্ষক ছিলেন। তবে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা নেন শামসুল হক বিএসসি। তিনি ইয়ুথ ক্যাম্প তৈরি করে সেখানে রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রৌমারীর সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়েই গড়ে তোলা হয়েছিল গেরিলা যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। এখানে ৬৫ হাজার যোদ্ধা প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন এলাকায় লড়াই করেছেন।

রৌমারীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পটি করা হয় স্থানীয় সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির মাঠের দক্ষিণ পার্শ্বে ইটের দেওয়াল গড়ে তৈরি করা হয় চাঁদমারি, যেখানে প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণার্থী গেরিলা যোদ্ধারা গুলি ছোড়ার অনুশীলন করতেন।

উপজেলার উত্তরে টাপুরচর এলাকার মো. আবু হাফিজ (বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার) তখন কলেজে পড়তেন। তিনিও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তার সাথে ছিলেন টাপুরচর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম। সেসময় ওই উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তাদেরই নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আরেকটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। যেখানে সেনাবহিনীর মেডিক্যাল কোরের সদস্য মো. সাহাব উদ্দিন, নৌ-বাহিনীর সিপাহী বশির উদ্দিন ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এর বাঙালি হাবিলদার নজরুল ইসলাম প্রশিক্ষক ছিলেন। তবে সেখানে কেবল লাঠি, ফলা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে এ ক্যাম্প গুটিয়ে নিয়ে সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পটিকেই পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হিসেবে গড়ে তোলেন উদ্যোক্তারা।

রৌমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল কাদের।

রৌমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার আব্দুল কাদের। টাপুরচর ক্যাম্পে কিছু দিন লেফট-রাইট করেন। এরপর এপ্রিলের মাঝামাঝি আবু হাফিজের নেতৃত্বে বাগুয়ার চরের মো. বদিউজ্জামানসহ অনেকে আসামের মানকারচর চলে যান। সেখান থেকে যান ধুবরী হয়ে কুচবিহারের ক্যাম্পে। সেখানে অবস্থান নেওয়ার পর প্রথমে অপেক্ষাকৃত বেশি শিক্ষিতদের বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) তৈরির লক্ষ্যে ভারতের দেরাদুনে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বাঙালি ইপিআর, আনসারসহ অন্যদেরও নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। কিন্তু কিছুদিন পর নুরুল ইসলাম পাপু মিয়া, মো. হাফিজ বিএসসি দেরাদুনে যোগাযোগ করে তাদেরকে নিয়ে আসেন রৌমারী ক্যাম্পে। ততদিনে সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে ভালোভাবেই গেরিলাযুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়া শুরু হয়ে যায়। যেখান থেকে ৬৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়ে বিভিন্ন স্থানে গেরিলা আক্রমণে নিয়োজিত হন। এখানে রেশন ও গোলা বারুদ আসতো ১১ নম্বর সেক্টরের মেঘালয়ের তেলডালা ক্যাম্প থেকে। যেটা ছিল জেড ফোর্সের হেড কোয়ার্টার। জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জ‍ামান।

রৌমারী ক্যাম্পে দেওয়া হতো ১৪ দিনের গেরিলা ট্রেনিং। ট্রেনিং শেষে গুলি ছোড়ার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল চাঁদমারী। সেটা তৈরি করা হয়েছিল সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে। বিশেষ কায়দায় তৈরি ৫০ ফুটের মতো লম্বা এবং ১০ ফুটের মতো উঁচু ইটের দেয়াল(অনেকটা ধনুকের মত বাঁকানো)। যার সামনে বাঁশের খুঁটি মাটিতে পুঁতে, আগায় গোলাকার ধারাই বেঁধে রাখা হতো। মাঝখানে আঁকা থাকত বৃত্ত। এটাই ভেদ করতে হতো প্রশিক্ষণার্থী গেরিলাদের। মুক্তিযোদ্ধারা পাঁচ রাউন্ড করে গুলি ছুঁড়তেন। এরপর শপথ পাঠ করিয়ে তাদের পাঠানো হতো যুদ্ধের ময়দানে।

তবে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য অনেকেই এখান থেকে কোর্স শেষে চলে যেতেন মেঘালয়ের তোরায়, তেলডালা কিংবা রংনাবার্গ ট্রেনিং ক্যাম্পে। মু্ক্তিযোদ্ধা একেএম শামসুল আলম রংনাবার্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ১১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার মহেন্দ্রগঞ্জেই যুদ্ধ করেন, যা জামালপুরের বকশীগঞ্জের ঠিক উপরে। তার প্রশিক্ষক ছিলেন ভারতীয় আর্মির ক্যাপ্টেন কৌশিক, অমর সিং, নায়েক মানব সিং ও ল্যান্স নায়েক গুর্মে সিং। অস্ত্র ও গোলাবারুদ যথারীতি ভারতই সরবরাহ করতো।

মুক্তিযোদ্ধা কেএম শামসুল আলম

১১ নম্বর সেক্টরকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য বকশিগঞ্জের ধানুয়া কামালপুরে পাকবাহিনী ব্যাপক শক্তি নিয়োজিত করেছিল। যেজন্য শামসুল আলমদের প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হয়েছে। পাকবাহিনী এখানে শক্তি নিয়োগ করার কারণ ছিল-মহেন্দ্রগঞ্জ থেকে মিত্রবাহিনীকে জামালপুর, টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকায় ঢুকতে না দেওয়া। পাকবাহিনী কখনই ঢাকা হাতছাড়া করতে চায়নি।

রৌমারী ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন হলেও এ এলাকার অনেকেই ৬ নম্বর সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুকরা এপ্রিলে আসামের মানকারচর থানার কাকড়িপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে যান। যার নেতৃত্বে ছিলেন গাইবান্ধার এমএনএ লুৎফর রহমান ও মতিউর রহমান। সেখান থেকে ঢুবরি, রাজগঞ্জ হয়ে সোজা জলপাইগুড়ি নিয়ে যাওয়া হতো তাদের। সেখানেই পাহাড়ের উপরে স্থাপন করা হয়েছিল মুজিব ক্যাম্প। যেখানে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালও ছিলেন।

বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলছেন রৌমারীরর মুক্তিযোদ্ধারা।

উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো. শাহার আলী ১৮ বছর বয়সে ক্লাস টেন এ পড়ার সময় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই মানকারচর যান। সেখান থেকে মুজিব ক্যাম্পে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ছবি তোলা হয়, দেওয়া হয় বডি নম্বর। এর আগে তারা শেখ কামালের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করেন।

শপথ শেষে হাতিয়ার অর্থাৎ স্টেন গান, গ্রেনেড ও এক্সপ্লোসিভ দিয়ে তাদের দিনাজপুরের তেঁতুলিয়া বর্ডারে পাঠানো হয়। ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন এ এলাকার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার। আর শাহার আলীর ৬ নম্বর সাব সেক্টরে কমান্ডার ছিলেন মেজর নেওয়াজেশ উদ্দিন। তেঁতুলিয়ার ভজনপুরে প্রথম সম্মুখ সমরেই তারা পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেন। এরপর সাহেবগঞ্জ, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, কড়িগ্রামে এবং সব শেষে নভেম্বর-ডিসেম্বরে উলিপুরে গেরিলাযুদ্ধ করেন শাহাব আলীসহ অন্য গেরিলাযোদ্ধারা।

মুক্তিযোদ্ধা শাহার আলী চাঁদমারীর দেয়ালে গুলির চিহ্ন দেখাচ্ছেন্

সুবেদার আফতাব আলীর বাড়ি সিলেটে। কিন্তু তিনি ২৫ মার্চের পরপরই রংপুর সেনানিবাস থেকে পালিয়ে চলে আসেন রৌমারীতে। এসময় তার সঙ্গে ছিল ভারী অস্ত্র। তার সঙ্গে পালিয়ে আসা কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গেও ভারী অস্ত্র ছিল। এদিকে ট্রেনিং শেষ করেছেন রৌমারী ক্যাম্পের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থীরা। এসময় চর রাজীবপুরের কোদালকাঠী দিয়ে পাকবাহিনী রৌমারীতে ঢোকার চেষ্টা করে। সে সময় আফতাব আলী ও তার সহযোগী এবং মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।  কোদালকাঠীতে যুদ্ধ করেন বীরপ্রতীক তারামন বিবিও। মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক প্রতিরোধের কারণে পাকিস্তানি আর্মি বহ্মপুত্রের এপাড়ে কখনই উঠতে পারেনি। সেই থেকেই রৌমারী ছিল মুক্তাঞ্চল।

মুক্তাঞ্চল হওয়ায় প্রবাসী সরকার গঠনের পর রৌমারীতে সরকারী কিছু দফতরও চালু করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে স্থাপন করা হয়েছিল টাকশাল। এছাড়া আদালতের কাজও চলতো। তাই সরকারী কার্যক্রম ও ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিদর্শনে মেঘালয়ের তেলডালা থেকে আসতেন জেড ফোর্স প্রধান জিয়াউর রহমান। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন মনসুরও রৌমারী পরিদর্শনে আসেন।

মুক্তিযোদ্ধা শাহার আলী

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের ও তার সতীর্থদের তৎপরতায় প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম এখান থেকেই শুরু হয় এপ্রিলের শেষ দিকে। প্রথম টাকশাল স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলা টাকার ব্যবহার শুরু হয়। যা ছিল আসামের মানকারচর সীমান্তের কাছাকাছি। প্রতিষ্ঠা করা হয় বিচার বিভাগও। জুনের দিকেই এখানে কোর্ট চালু করা হয়। মহকুমা প্রশাসক আব্দুল লতিফ রৌমারিতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এছাড়া এখান থেকে ‘অগ্রদূত’ নামে একটি পত্রিকাও বের হতো। যা বের করতেন সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক।

যুদ্ধের সময় রাজাকার বা পাকবাহিনীর কোনো সহযোগী সংগঠন এখানে তৎপরতা চালাতে পারেনি। কেননা, এটা প্রথম থেকেই মুক্ত অঞ্চল। ২৫ মার্চের আগে থেকেই মুসলিম লীগ নেতা ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হাজী মনসুর আহমেদ ও ছাত্রসেনার সদস্য সিরাজুল ইসলাম গাইবান্ধায় বসবাস করতেন। যারা রৌমারী এলাকারই নাগরিক। তবে তারা গাইবান্ধাতে রাজাকার হিসেবে তৎপরতা চলিয়েছেন। এজন্য যুদ্ধের সময় প্রতিদিন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মনসুর আহমেদের বড় ছেলে আজিজুর রহমানের হাজিরা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা।

রৌমারী থেকে ট্রেনিং নিয়েই গেরিলাযোদ্ধারা ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন পাড়ে যুদ্ধে অংশ নিতেন। মাঝেমধ্যেই বড় বড় অপারেশনে গিয়ে ভুলের খেসারতও দিতে হতো তাদের। এমনই এক রাত ছিল ১১ অক্টোবর। সেদিন ৮টি টিমের প্রতিটিতে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে চিলমারীতে পাকিবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণের পরিকল্পনা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন সুবেদার আব্দুল মান্নান। ভারতের গোলন্দাজ বাহিনীও প্রস্তুত ছিল। চিলমারী ওয়াপদা বিল্ডিংয়ে ছিল পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। সন্ধ্যার পরপরই আব্দুল কাদের তার টিম নিয়ে ওয়াপদা বিল্ডিংয়ের পাশে অবস্থান নেন। অন্য টিমগুলোও যার যার অবস্থান নেয়।

রৌমারীর সিজি জামান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

রাত ১২টার দিকে সিগন্যাল পেয়েই মর্টারের গোলা ছোড়া শুরু করে দেয় ভারতের গোলন্দাজ বাহিনী। তাদের টানা মর্টার শেল নিক্ষেপে ওয়াপদা বিল্ডিংয়ের স্থলে তছনছ হয়ে যায় চালমারী গার্লস স্কুল। অর্থাৎ লক্ষ্য ভুল করে গোলন্দাজ বাহিনী। ফলে পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান টের পেয়ে যায়। তারা তখন অনবরত মর্টার থেকে গোলা ছোঁড়া শুরু করে দেয়। এছাড়া বন্দুক থেকেও একেবারে বৃষ্টির মতো গোলা ছুঁড়তে থাকে তারা।

পাকবাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লেও মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নির্ণয় করতে পারল না। যে কারণে তারা লাইট পিস্তলের গুলি ছুড়ল। সমস্ত আকাশ সঙ্গে সঙ্গে আগুনের স্ফুলিঙ্গে আলোকিত হয়ে ওঠল। আব্দুল কাদেরের সহযোদ্ধা মজিদ মনে করলেন, তাদেরই মর্টার থেকে ছোঁড়া গোলার আঘাতে পাকবাহিনীর সদস্যরা শেষ হয়ে গেছে। তিনি দৌড়ে গিয়ে পাকবাহিনীর বাংকারের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে নামলেন। মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। বোকামির কারণে প্রাণ হারালেন মজিদ।

ভেরি লাইট পিস্তলের গোলা ছোড়ায় কাদেরদের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে গেল। পাকিবাহিনী এবার টার্গেট নিয়ে মর্টার থেকে গোলা ছুড়তে লাগলো। সামনের এগুনোর কোনো উপায় না থাকায় সুবেদার আব্দুল মান্নান অন্য ৭টি টিমকেই পিছু হটার নির্দেশনা দিলেন। ভুলে গেলেন কাদেরদের কথা। ফলে তারাও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন। পাকবাহিনীর ক্রমাগত মর্টার থেকে গোলা নিক্ষেপে ৬ জন গেরিলাযোদ্ধা মারা গেলেন। গুলিবিদ্ধ হলেন কাদেরও। গোলাবর্ষণ থামলে ক্রলিং করে একটু দুরেই একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে তিনি। ঘণ্টাখানেক পর সে বাড়িতে মুক্তিবাহিনীকে খুঁজতে এসে এক বৃদ্ধকে গুলি করে মেরে ফেলল পাকসেনারা। তবে খড়ের গাদায় লুকিয়ে থাকায় কাদেরকে খোঁজ পেল না হানাদাররা। এ অবস্থায় রাত পোহালে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধ শেষ হলে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারির দিকে দেশে ফেরেন কাদের।

যারা তথ্য দিয়েছেন:
রৌমারী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল কাদের, ডেপুটি কমান্ডার, মো. শাহার আলী, মুক্তিযোদ্ধা একেএম শামসুল আলম ও বদিউজ্জামান।

সহযোগিতায়:

 আরও পড়ুন:

** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’

** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী
** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৭৫৯ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১১, ২০১৬
ইইউডি/জেএম/

আবারো বিতর্কে জড়ালেন কঙ্গনা
সাত মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন, মামলা হয়নি
সুদের পাওনা টাকার জের ধরেই গৌরাঙ্গকে হত্যা করা হয়
ঈদের আগে জামিন মিললো ৪২ শিক্ষার্থীর
বাজপেয়ীর মৃত্যুতে ত্রিপুরায় মাসব্যাপী কর্মসূচি