Alexa

পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি এবং ভিডিও: শাকিল আহমেদ

ভৌগলিক সুবিধার কারণে মুক্তিবাহিনীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম। আর পাকবাহিনীর কাছে এই স্থানটি ছিল অপ্রতিরোধ্য আর দুষ্প্রবেশ্য।

পাটগ্রাম,লালমনিরহাট: ভৌগলিক সুবিধার কারণে মুক্তিবাহিনীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম। আর পাকবাহিনীর কাছে এই স্থানটি ছিল অপ্রতিরোধ্য আর দুষ্প্রবেশ্য। এ কারণে সহজেই এখানে মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল।

পাটগ্রামের আকৃতি অনেকটা কলসের মতো। যার পেটটা ভারতের ভেতরে প্রসারিত। আর মুখটা ঠিক যেন দেশের ভূখন্ডের দিকে উঁকি মারছে। যা বাউড়া নামে পরিচিত। আর এর দুই পাশেই ভারত। বাউড়ায় ছিল মুক্তিবাহনীর শক্ত ডিফেন্স। ২৫ মার্চের আগে থেকেই সেখানে বাঙালি ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস), পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন।

ছবিতে হাসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ দেখা যাছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৬ নম্বর সেক্টরের প্রশিক্ষণার্থী গেরিলা যোদ্ধারা এই ভবনকে ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করতেন।

এলাকাটির পশ্চিমে ভারতের কুচলিবাড়ী আর পূর্বে শীতলকুচি। যে দুই অংশেও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্রিয় অবস্থান ছিল। এই ত্রিমুখী ডিফেন্সের কারণে পাকবাহিনী ভেতরে ঢোকার সাহস করতো না। ফলে প্রথম থেকেই পাটগ্রাম ছিল মুক্ত অঞ্চল।

লালমনিরহাট থেকে হাতিবান্ধা, পাটগ্রাম,বুড়িমারী বর্ডার হয়ে একটি রেল লাইন ছিল কুচবিহারের দিকে।যুদ্ধ শুরু হলে বর্ডারের দু’পাশ থেকেই রেল লাইন তুলে ফেলা হয়। আর এতে যে রাস্তা তৈরি হয়, এর উপর দিয়ে চলে আসে ভারতের আর্মির ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, গোলাবারুদ ও রেশন। ভারতও প্রায় প্রথম থেকেই এখানে জোরালো ব্যাকআপ দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকেই সেক্টর গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বুড়িমারীতে স্থাপন করা হয় ৬ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার। এজন্য বাউড়াতে আগে থেকেই ডিফেন্সকে আরো শক্তিশালী করে তোলে ভারতীয় ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান।

৬ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার খাদেমুল বাশারের কার্যালয়। এখানে ভারী অস্ত্রও রাখা হতো।


৬ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয় বুড়িমারী হাসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে। যার উত্তর পশ্চিম কোণার বিজ্ঞানাগারের এক পাশে বসানো হয় সেক্টর কমান্ডার উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশারের কার্যালয়। আর অন্য পাশে রাখা হয় অস্ত্র গোলাবারুদ। প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যারাক বানানো হয় দক্ষিণ দোয়ারী টিন শেড বিল্ডিংটিকে। পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একটি ঘরে সপরিবারে বাস করতেন সেক্টর কমান্ডার উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার।

ভারতীয় আর্মির সাঁজোয়া যান ও ট্রাক বন্দর থেকে সরাসরি একেবারে বিদ্যালয় মাঠেই চলে আসত। স্কুলের পেছনে দিয়ে বয়ে গেছে ভারত থেমে নেমে আসা ধরলা নদী। যার পাড়েই তৈরি করা হয় চাঁদমারী (গুলি ছোঁড়ার প্রশিক্ষণ নেওয়ার স্থান)।

যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে সেক্টর হেড কোয়ার্টারের কিছুই সংরক্ষণ করা হয়নি। সেক্টর প্রধানের এ কার্যালয়টিও যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।

স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের গোসলের জন্য অনেকগুলো টিউবওয়েলও বসানো হয়েছিল। আর পেছনের বিশাল খোলা জায়গায় দেওয়া হতো প্রশিক্ষণ।

৬ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর কোম্পানির সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন মহিউদ্দিন। সেক্টর গঠনের আগেই তিনি ৪৬ জনকে নিয়ে জলপাইগুড়ির মুজিবক্যাম্পে ২১ দিনের অস্ত্র চালনা এবং ১০ দিনের জিএল(গ্রুপ লিডার) ট্রেনিং নেন। তার কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন ভারতের আর্মির ক্যাপ্টেন বিজয় মোহন। সেক্টর গঠনের আগে ভারতীয় আর্মির লোকেরাই গেরিলাদের নির্দেশনা দিতেন। ট্রেনিং শেষে তিনি ভারতের ফুলবাড়ী হয়ে লালমনিরহাটের দইখাওয়া এলাকায় প্রবেশ করেন মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।

বুড়িমারী বন্দর। কুচবিহারের সঙ্গে এ পথেই ছিল রেল যোগাযোগ। যুদ্ধের সময় রেল লাইন তুলে ফেলে সাজোঁয়া যান-ট্যাংক-ট্রাক চলাচলের উপযোগী করা হয়। ভারতের অংশটিতে এখনো রেল লাইন আছে।

ট্রেনিং শেষে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় আর্মির তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বক্তৃতা করে গেরিলাদের যুদ্ধের প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। তাদের বক্তৃতা বাংলায় তর্জমা করে ৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে শুনিয়েছেন তিনি। ভারতীয় আর্মির ব্রিগেডিয়ার যোশী সেদিন বলেছিলেন ‘তোমার দেশে নারীদের, মা-বোনদের ইজ্জত লুট করছে পাকিস্তানি আর্মি। সম্পদ নষ্ট করছে। প্রতিষ্ঠান ধংস করছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। এখন তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তা প্রতিহত করা।’

মহিউদ্দিনরা প্রথম দিকেই ট্রেনিং নিয়েছিলেন। সে সময় তারা ভাসানী উইং, তাজউদ্দীন উইং, ক্যাপ্টেন মনসুর উইং, নজরুল ইসলাম উইং নামে ভাগ হয়ে প্রশিক্ষণ নিতেন। তিনি ছিলেন ভাসানী উইংয়ের গেরিলা।

মুক্তিযোদ্ধা এএইচএম মহিউদ্দিন বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলছেন।

তৎকালীন এমএনএ আবেদ আলী, কাজী নরুজ্জামান, বুড়িমারী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ কাজী আব্দুল গণির নেতৃত্বে তারা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সংগঠিত হয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের একটি হাসপাতালের কেরানির চাকরি থেকে ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। যুদ্ধের ডামাডোল বাজলে তিনি আর সেখানে না গিয়ে ২২ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বুড়িমারীর তাঁতীপাড়ার সিরাজুল ইসলাম। এপ্রিলের প্রথমেই দুলাভাই এমএনএ আবেদ আলীকে ট্রেনিংয়ের পাঠানোর ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানালে তিনি সিরাজুল ইসলামকে আরো কিছু ছেলে আনতে বলেন। এরপর নিজের ছোট ভাই, খালাতো ভাইসহ ৩৫ জনকে নিয়ে আবেদ আলীর সহায়তায় ভারতের চেংরাবান্ধা হয়ে টাপুরহাট চলে যান। সেখান থেকে জলপাইগুড়ির মুজিবক্যাম্পে পৌঁছান তারা।

মুক্তিযোদ্ধা এএইচএম মহিউদ্দিন সেক্টর প্রধানের কার্যালয় দেখাচ্ছেন।

সেখানে মোট ৩৪ দিনের ট্রেনিং শেষে তিনি জুনিয়র লিডার (জিএল) হন। উচ্চতর ট্রেনিং হিসেবে তাকে এসএলআর, এসএমজি, এলএমজি, রিভলবার চালনা ও গ্রেনেড ছোঁড়া, অ্যান্টি পারসনাল মাইন, অ্যান্টি ট্যাংক মাইন ও বিস্ফোরক ট্রেনিং দেওয়া হয়। তার প্রশিক্ষক ছিলেন ভারতের ক্যাপ্টেন আর কে বালি।

ট্রেনিং শেষে আফসার কোম্পানিতে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের মোট ১০০ যোদ্ধাকে জুন মাসের শুরুর দিকে পাঠানো হয় ভারতের শিতলকুচি বর্ডারে। যার নিচেই বাংলাদেশের দইখাওয়া। সেখানে ৭দিন থেকে বিভিন্ন স্থানে গেরিলাযুদ্ধে লিপ্ত হতেন সিরাজুল ইসলামরা। এরপর দইখাওয়াতেই ক্যাম্প করা হলো। সেখান থেকে লালমনিরহাটের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে গেরিলা হামলা চালাতেন তারা।

মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম।

এরপর তাদের পাঠানো হয় নীলফামারীরর ডোমার, ডিমলা, চিলাহাটিতে। একদিন দুপুরে সিরাজুল ইসলামদের হঠাৎ বলা হলো, রাতে পাকবাহিনীর চিলাহাটি ক্যাম্পে অপারেশন হবে। তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফজরের নামাজের পর সেখানে চা খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে ৪টি কোম্পানির ৪শ মুক্তিযোদ্ধা সন্ধ্যার পর থেকেই অবস্থান নিতে শুরু করেন পাকিস্তানিদের চিলাহাটি ক্যাম্পের চারপাশে। রাত ১টা থেকে শুরু হয় ব্যাপক গুলাবর্ষণ। ভোরের দিকে হঠাৎ গুলাবর্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। ওরা থ্রি ইঞ্চ মর্টার দিয়ে শেল ছুঁড়তো। আর গেরিলাদের ছিল টু ইঞ্চ মর্টার। গুলি থেমে গেলে ধানক্ষেতের ভেতর চুপ করে বসে থাকলেন মুক্তিযোদ্ধা। হঠাৎ ধানগাছের নড়াচড়া দেখে সিরাজুল ইসলাম নির্দেশ দেন যেখানে যেখানে ধানগাছ নড়ছে, সেদিকে মর্টার শেল নিক্ষেপের। এরপর তারা গুলি ছুঁড়তেই পাকবাহিনীও তিন দিক থেকে এলোপাতাড়ি গুলি আর মর্টার শেল ছোঁড়া শুরু করে। পিছু হটতে হটতে আর কোথায় যাওয়ার জায়গা না থাকায় তিস্তা নদীতে নেমেই পিছু হটলেন মুক্তিযোদ্ধারা।

এই অপারেশনে সেদিন একটি কোম্পানির ১শ জনের মধ্যে একজনের খোঁজও আর পাওয়া যায়নি। পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, যারা নদীতে ভেসে বেঁচে ছিলেন, তারা ৭দিন পর দগগ্রামে মিলিত হন। কিন্তু ৭ জন ছাড়া কেউ অস্ত্র নিজের কাছে রাখতে পারেননি। সবাই নদীতে ফেলে এসেছেন। এরপর চেংরাবান্ধায় ক্যাম্পে যোগাযোগ করা হলে ভারতের এক কর্নেল আবারও রাইফেল দেন।

হাসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নানান অভিযোগ জানাচ্ছেন।

ট্রাক ভরে অস্ত্র দিতো ভারত। গুলিও কখনো শেষ হতো না। সিরাজের কোম্পানির ১শ জনের জন্য ১শ রাইফেল প্রথম দিনই দেওয়া হয়েছে। এনিয়েই তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন তিনি।

বাংলাদেশের ভেতরে যুদ্ধের সময় একমাত্র সেক্টর হেড কোয়ার্টার ছিল বুড়িমারী। অথচ যে স্কুলে এটি করা হয়েছিল, সেই স্কুলের ঐতিহাসিক ভবন রক্ষায় কারো কোনো উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারাসহ বুড়িমারী হাসর উদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষোভের কোনো শেষ নেই।

বর্তমানে স্কুলে সেক্টর কমান্ডারের বসার ঘর ছাড়া তেমন কোনো চিহ্ন নেই। যুদ্ধের সময় যেটা ব্যারাক ছিল সেটিও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। যদিও সেটাতেই ক্লাস নেওয়া হয়। আর সেক্টর কামান্ডারের অফিস ভবনটিও যে কোনো মুহুর্তে ভেঙ্গে পড়তে পারে। কমান্ডারের বসার ঘরে টেবিল-চেয়ার ছিল, জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ কিছুদিন আগে তা নিয়ে গেছে। এছাড়া পেছনের চাঁদমারীও দখল হয়ে গেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিবিজড়িত এই ক্যাম্প প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, এএইচএম মহিউদ্দিন ও হাসর উদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রবিউল আলম।

 

সহযোগিতায়:

 আরও পড়ুন:

** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন


বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

সিঙ্গাইরে পিকআপ-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ 
আমানতের সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে পর্তুগাল, গোল করেছেন রোনালদো
পত্নীতলায় গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
মেহেরপুরে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার