Alexa

সীমান্তের রণাঙ্গনে ওয়্যারলেস নিয়ে যুদ্ধ

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য ইতিবাচকভাবে পাল্টে দিতে পারতো যুদ্ধের গতিপথ।  কিন্তু তথ্য আদান-প্রদান ছিলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় রীতিমতো দুরূহ কাজ। প্রযুক্তিও এতো উন্নত ছিল না সেসময়।

নওগাঁ: সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য ইতিবাচকভাবে পাল্টে দিতে পারতো যুদ্ধের গতিপথ।  কিন্তু তথ্য আদান-প্রদান ছিলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় রীতিমতো দুরূহ কাজ। প্রযুক্তিও এতো উন্নত ছিল না সেসময়। আবার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সশরীরে যাওয়াও ছিল নিরাপত্তা জন্য হুমকি। আর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দ্রুত যোগাযোগ ছিল জরুরি। বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে থাকা ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ। শুধু মিত্র বাহিনী নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদানও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এসব বিবেচনায় ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে বাছাইকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তৈরি করা হয় ওয়্যারলেস সেট ইউনিট। তাদের সম্মুখযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি দেওয়া হয় ৩২ দিনের বিশেষ ট্রেনিং। এটা ছিলো নৌকমান্ডোদের মতো অনেকটা সুইসাইডাল স্কোয়াড। ধরা পড়া নিশ্চিত জানলে করণীয় একটাই---আত্মহত্যা।

ভারতের মালদহ জেলার রায়গঞ্জে ছিল এমন একটি ক্যাম্প। এ ক্যাম্পের ১ হাজার ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে থেকে ১২ জনকে বাছাই করা হয় ওয়্যারলেস স্পেশালিস্ট হিসেবে তৈরি করার জন্য। ভারতীয় বাঙালি কর্নেল ভট্টাচার্য রায়গঞ্জ ক্যাম্পে ওয়্যারলেস ইউনিটকে প্রশিক্ষিত করে তোলেন।

এই ট্রেনিংয়ে প্রধানত সংকেত শেখানো হতো। যেমন আলফা-এ, চার্লি-সি, ডেল্টা-ডি, ব্রেভো-বি । এছাড়াও শেখানো হতো সেট ব্যবহারের নানা দিক।

যেদিন প্রথম ইউনিটের টেনিং শেষ হয় সেদিন কর্নেল ওসমানী, তাজউদ্দিন আহমেদ রায়গঞ্জ ক্যাম্পে যান। এমনটাই জানাচ্ছিলেন ওয়্যারলেস সেট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর বিভিন্ন সংবাদ আদান-প্রদানকারী সাপাহারের খন্দকার আবেদ হোসেন। ১১ ও ৭ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধে করেন তিনি।

প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ইউনিটের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়্যারলেস ইউনিটের যোদ্ধা থাকতো। ওয়্যারলেস সেটগুলোর ফ্রিকোয়েন্সির আওতা  ছিলো ৬ কিলোমিটার পর্যন্ত। সেটগুলোর আকৃতি ছিলো রেডিওর মতো।

৩২ দিনের ট্রেনিং শেষ হলে ওয়্যারলেস স্পেশালিস্টদের ৬টি গ্রেনেড, একটি দেশলাই বাক্স , একটি সংকেত বই ও জামা-কাপড় দিয়ে বিভিন্ন সীমান্তে পাঠানো হতো। গ্রেনেড দেওয়া হতো আত্মরক্ষার জন্য। আর দেশলাই বাক্স দেওয়া হতো ধরা পড়া নিশ্চিত জানলে সংকেত-বইটি পুড়িয়ে ফেলার জন্য। কারণ সংকেত শত্রুবাহিনী জেনে যাওয়া মানে ভয়াবহ বিপর্যয়।

বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মিত্রবাহিনীর সহযোগিতার বার্তা পেতে ওয়্যারলেসই ছিল সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।

সাধারণত কোনো অপারেশনে যাওয়ার আগে ওয়ারলেস টিম কাজ করতো অনেকটা রেকি করার মতো বা গোয়েন্দার মতো। তাই বলা চলে, তারা একই সঙ্গে রেকিম্যান, অস্ত্রযোদ্ধা আবার ওয়্যারলেস হাতে সুইসাইডাল স্কোয়াডের মতো থেকেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে।
কোনো স্থান রেকি করতে যাওয়ার আগে ওয়্যারলেস সেটগুলো গোপনে কোথাও রেখে দিতেন যোদ্ধারা। পরনে থাকতো ছেঁড়া গেঞ্জি, হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি উল্টে রাখালদের মতো করে পরা। অনেকসময় খানসেনারা সামনে পড়ে যেতো। তখন হাতে লাঠি নিয়ে বকড়ি বা গরু চরানোর ভান করতেন তারা। এভাবে পুরো এলাকা রেকি করে দিন বা রাতে কোনো নিরিবিলি জায়গা দেখে ওয়্যারলেসে ক্যাম্প প্রধানদের জানিয়ে দিতেন।

বিশেষ করে রাতে যুদ্ধের সময় ওয়্যারলেস অপারেটরদের সাহায্য নেওয়া হতো বেশি। অপারেশনের সময় কোনদিকে শেলিং করতে হবে, কোনদিকে পাকিস্তানি ডিফেন্স- এসব জানতে চাওয়া হতো। তখন বলে দেওয়া হতো বামদিকে আরও একশো গজ বা ডানদিকে ৫০ গজ দূরে ফেলতে হবে। সীমান্ত থেকে অ্যাডভান্স হওয়ার সময় এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যোগাযোগ রক্ষা হতো ওয়্যারলেস সেটে।

কোনো বড় অপারেশনে গেলে মিত্রবাহিনীকে পেছন থেকে সাপোর্ট বা সংকেত দেওয়ার কাজে ওয়্যারলেসই ছিল প্রধান হাতিয়ার। সীমান্তের ওপারে ভারতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পগুলো ছিল কাছাকাছি। তাই যোগাযোগ করা যেতো সহজে। আর বেশি ভেতরে ঢুকে যুদ্ধ করতে হলে কাছাকাছি কোনো মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের সঙ্গে রিলে করে দেওয়া হতো খবর।

মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত ওয়্যারলেস সেটগুলো সরবরাহ করতো ভারত। তবে এগুলো কোন দেশের তৈরি তা জানতেন না আবেদ। ওয়্যারলেস প্রশিক্ষিতরা কোনোভাবে খানসেনাদের হাতে ধরা পড়লে তার পরিণাম হতো ভয়াবহ । বগুড়া পুলিশ লাইন্সে থাকাকালীন এক যোদ্ধা ওয়্যারলেসসহ ধরা পড়েন। যদিও নিজের কাছে থাকা সংকেত বইটি তিনি পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হন। পরে বগুড়ার বিভিন্ন সড়কে তাকে গাড়ির পিছনে দড়িতে বেঁধে টেনি-হিঁচড়ে হত্যা করা হয়।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন

** পদ্মাপাড় লাগোয়া সীমান্তে মর্টার নিয়ে যুদ্ধ
** রাতে সীমান্ত পেরিয়ে কৌশল বাতলে দিতেন শিখ সেনারা
** বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন: সভার আড়ালে শপথগ্রহণ
** ‘পাকিস্তান বাগান’: একাত্তরের অরক্ষিত বধ্যভূমি
** জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল
** শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো ভৌতিক কলেরা মিথ
** পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
** মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার


বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬
এএ/জেএম/

পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানবাহনের দীর্ঘলাইন
কারাগারে ঈদ উৎসবে মেতে থাকবে ১০ হাজার বন্দী
ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন করমজল
কনার ঈদ গানের ডানায়
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু