Alexa

কোপ খেয়েও বধ্যভূমি থেকে বেঁচে ফেরেন চকবরকতের আবেদ

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও অাসিফ আজিজ- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৭১ সাল। ১৮ জুন, শুক্রবার। জুমার নামাজের সময়। মসজিদে কয়েকশো মুসল্লি জড়ো হয়েছেন নামাজ আদায়ের জন্য। নামাজও প্রায় শেষ তখন।

জয়পুরহাট: ১৯৭১ সাল। ১৮ জুন, শুক্রবার। জুমার নামাজের সময়। মসজিদে কয়েকশো মুসল্লি জড়ো হয়েছেন নামাজ আদায়ের জন্য। নামাজও প্রায় শেষ তখন। আচমকা মসজিদের বাইরে এসে থামল পাকিস্তানিদের একটি গাড়ি। দড়াম দড়াম আওয়াজ তুলে বুট জুতো পরেই মসজিদে ঢুকল ১০-১২জন। বের করে নিয়ে গেল সবাইকে, শেষ করতে দিলো না নামাজ। মল্লিকপুরে তাদের একটি জিপ পড়ে গেছে মুক্তিবাহিনীর পাতা মাইনে। তুলতে হবে সেটি। তাই এই অতর্কিত হানা।


চোয়ালে এখনও সেই কোপের দাগ।

বলতে বলতে কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল গণকবর থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা আবেদ আলীর। জয়পুরহাট সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম পাগলা দেওয়ান। মাজারের জন্য আলাদা পরিচিতি ছিল জায়গাটির। সেই পরিচিতি নতুন পরিচয় পায় একাত্তরের যুদ্ধে। বধ্যভূমির গ্রাম। আবেদ আলীর বাড়ি পাশের চকবরকত গ্রামে। সীমান্ত উপজেলা পাঁচবিবির পুবে ভারতে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলো ছিল কামারপাড়া, কুরমাইল, বালুরঘাট ও শ্রীবিজয় ডাঙায়। পাগলা দেওয়ান থেকে সীমান্ত এক কিলোমিটার। ওপারে ভারতের পিরোজপুর। ক্যাম্পের নাম ছিল কুরমাইল। এই পাঁচবিবিরই নন্দইল মিশন গ্রামে পাকবাহিনী হত্যা করে চার সাঁওতালকে। যেখানে তাদের হত্যা করা হয় তার পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের স্মরণে নির্মিত দেশের একমাত্র ভাস্কর্য।


কোপের দাগ রয়েছে কাঁধেও।

যুদ্ধের সময় অন্তত ১০ হাজার মানুষকে পাগলা দেওয়ানে এনে হত্যা করা হয় বলে জানান মুক্তিযোদ্ধারা। মোজাম্মেল দেওয়ানের বাড়ি ও তার আশপাশে ছিল পাকবাহিনীর ক্যাম্প ও বাংকার। বাড়ির পাশের একটি জায়গা ছিল বধ্যভূমি। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিগুলোর একটি এই পাগলা দেওয়ান। এখানে শুধু গুলি করে নয়, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ নারী-পুরুষকে মারা হয়েছে কুপিয়ে। যারা মাটি খুঁড়ে গর্ত করেছে, তাদের চাপা দেওয়া হয়েছে সেই গর্তেই। কখনও মারা হয়েছে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে।

যাদের কুপিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয় তাদেরই একজন বেঁচে থাকা আবেদ আলী।


কথা বলছেন মোজাম্মেল দেওয়ান।

মসজিদ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সেদিন যে রাগ-ক্ষোভ ছিল, বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়ও সেই ক্ষোভ যেন ফুঁসে উঠলো আবার। ধারাল অস্ত্রের কোপে কাটা চোয়ালে কথা আটকে যাচ্ছিল বারবার। সেদিন আষাঢ়ের কাদা মাটিতে দেবে যাওয়ায় জিপটি তুলতে অনেক কষ্ট হয় সবার। কিন্তু জিপ টেনে তুলেও রেহাই মেলেনি। ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। খানসেনাদের রাগের কারণ মুক্তিবাহিনীর পেতে রাখা মাইনেই তাদের গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মারা যায় তাদের সাতজন।


ধরে এনে রাখা হয় পাগলা দেওয়ান ক্যাম্পের পাশে মোজাফফরের বাড়ি। তার বাড়িতে ছিলো একটি বাঁশের মাচা। সেখানে বসিয়ে রাখা হয় আবেদসহ কয়েকজনকে। এসময় কয়েকজনকে ছেড়ে দিয়ে পাহারা দিতে বসানো হয় যেন মুক্তিফৌজ এদিকে আসছে কিনা তা দেখতে। এলে খবর দিতে হবে। একজন শিক্ষক ছিলেন দলে। বাহার মাস্টার। তাকে বলা হয়, ‘শালে মাস্টার , উর্দু বাত করো, কোন ধারসে মুক্তি আয়ে গা, হামারা জিপ বাস্ট হো গায়া, সাত ‍আদমি মর গিয়া। বাতা।’ বলেই তাকে মারধর করা হয়। পরে মেরেই ফেলা হয় তাকে।

ওখান থেকে আবেদসহ অন্যদের নেওয়া হয় একটি মাটির বাড়িতে। ক্যাম্পের সাথেই। সেখানে পাঁচজন সেনা আসে। তখনও জানতেন না ভাগ্যে কি আছে। কোদাল ধরিয়ে দিয়ে বললো মাটি খুঁড়তে। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বিকেল ৫টা হয়ে যায়। পরে নিয়ে আসা হয় মাটির একটি ঘরে।

সন্ধ্যার কিছু পর নিয়ে ‍যায় কয়েকজনের সঙ্গে আবেদ আলীকেও। দাঁড় করায় গর্তের পাশে। তারপর ছয়টি লাইন করে দাঁড় করানো হয় কয়েকশো মানুষকে। একসময় বললো, ‘না এতো মানুষ মারবো না।’


আজও টিকে আছে পাকিস্তানিদের বর্বরতার বাংকার

একথা বলে কিছু মানুষকে ছেড়ে দেয়। লাইন তখন করে তিনটি। দাঁড় করানো হয় গর্তের পাশে। তারপর জানতে চাওয়া হয় মুসলমান কিনা। মুসলমান বললে বলে, কলমা পড়তে। একদিকে নওপাড়া, ইচড়া, মল্লিকপুর আর চকইসাপুরের মানুষকে দাঁড় করানো হয়। অন্যদিকে চিরলা, নওপাড়া, চকবরকতের মানুষ।

আবেদ আলীকে কোপ দেয় কান থেকে কাঁধ বরাবর। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যান গর্তে। হারিয়ে ফেলেন জ্ঞান । সেদিন দুর্ভাগ্যের মধ্যেও ভাগ্য প্রসন্ন ছিল তার। একটু পরেই শুরু হয় বৃষ্টি। ফলে তাদের আর মাটিচাপা দিতে পারেনি হানাদার বাহিনী।


রাত আনুমানিক ১টার দিকে জ্ঞান ফিরলে দেখেন বৃষ্টি হচ্ছে। আবেদ তখন সেখান থেকে কোনো রকম পালিয়ে যান শিবপুর গ্রামের আনসার মাস্টারের বাড়িতে। ওখান থেকে পরে চিকিৎসার জন্য ভারতের বালুরঘাট যান। সুস্থ হন দুই মাস পর। এভাবে বেঁচে ফেরেন চকবরকতের আরও একজন। সোলায়মান আলী।


শহীদ চার সাঁওতালের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য।

এই বধ্যভূমি থেকে ১শ গজ দূরে এখনও টিকে রয়েছে পাকসেনাদের অত্যন্ত মজবুত করে গড়া একটি কংক্রিটের বাংকার। স্থানীয় কিছু মিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করা হয় সেসময়। এই বাংকার থেকে আশপাশের অন্য ক্যাম্পগুলোতে যোগাযোগ করার জন্য সুড়ঙ্গপথ ব্যবহার করতো তারা। ঠিক এই বাংকারের পাশেই বাড়ি  মো. ইমদাদুল হকের। তখন তার বয়স ৭। দাদির কাছে শুনেছেন, পাকিস্তানিরা এখানে গরু, ছাগল ধরে এনে জবাই করে খেতো। আর তাদের বাড়িটি ছিলো প্রমোদের জায়গা। নারীদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। দেশ স্বাধীন হলে বাড়ি ফিরে এসে তারা অনেক চুড়ি, শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট পেয়েছেন সেখানে। আর এই বাংকারের উপর তিন ফুট মাটি ছিলো। তার উপর ছিল সবুজ ঘাস। বাংকারের ভিতরে দু’তিনজন মেজর থাকতো। কাছে না এলে বোঝা যেত না এটি একটি বাংকার।


এ বাড়িটি ছিল পাকবাহিনীর ক্যাম্প।

এখনও কাঠামোটি তেমনই আছে। ছাদের পলেস্তারা কিছু খসে পড়েছে। ঢালাই দেওয়া লোহার মোটা রডগুলো এখনও মজবুত। সেগুলো এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে বর্বরতার চিহ্ন।


কথা বলছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

এই বাংকার থেকে দু’তিন কিলোমিটার দূরের গ্রাম নন্দইল মিশন। ওই গ্রামে দুই সাঁওতাল পরিবারের চার সদস্য লক্ষণ হেমরণ, লক্ষণ সরেন, জোসেফ হেমরন ও মন্টু সরেন কাঠ কুড়াচ্ছিলেন জঙ্গলে। সেখানে তাদের ঘেরাও করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। পাশের ধরঞ্জিতে ছিল পাকক্যাম্প। ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর এ শহীদদের স্মরণে সেখানে ২০১১ সালে নির্মিত হয়েছে একটি ভাস্কর্য। এটিই ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর  শহীদদের স্মরণে নির্মিত দেশের একমাত্র ভাস্কর্য।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন

** সীমান্তের রণাঙ্গনে ওয়্যারলেস নিয়ে যুদ্ধ
** পদ্মাপাড় লাগোয়া সীমান্তে মর্টার নিয়ে যুদ্ধ
** রাতে সীমান্ত পেরিয়ে কৌশল বাতলে দিতেন শিখ সেনারা
** বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন: সভার আড়ালে শপথগ্রহণ
** ‘পাকিস্তান বাগান’: একাত্তরের অরক্ষিত বধ্যভূমি
** জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল
** শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো ভৌতিক কলেরা মিথ
** পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
** মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার

বাংলাদেশ সময়: ০৮০৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৬
এএ/জেএম

ঘটনার বর্ণনা করেন:
পাঁবিবি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মিসির আলী, মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসহাক আলী,মো. আনসার আলী, শ্রী মহেন্দ্র, দুর্যোধন, বধ্যভূমি থেকে বেঁচে ফেরা মো. আবেদ আলী, মোজাম্মেল দেওয়ান, যার নিজেরই জায়গায় এ বধ্যভূমি।

আবারো বিতর্কে জড়ালেন কঙ্গনা
সাত মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন, মামলা হয়নি
সুদের পাওনা টাকার জের ধরেই গৌরাঙ্গকে হত্যা করা হয়
ঈদের আগে জামিন মিললো ৪২ শিক্ষার্থীর
বাজপেয়ীর মৃত্যুতে ত্রিপুরায় মাসব্যাপী কর্মসূচি