Alexa

ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও শাকিল আহমেদ- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

রেলওয়ে কারখানায় কাজ করতে অনীহা ছিল বাঙালিদের। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় তাই বিহারীদের জায়গা দেওয়া হয় সৈয়দপুরে। এখানে এসে তারা নীরবেই বসবাস করতে থাকে।

সৈয়দপুর, নীলফামারী: রেলওয়ে কারখানায় কাজ করতে অনীহা ছিল বাঙালিদের। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় তাই বিহারীদের জায়গা দেওয়া হয় সৈয়দপুরে। এখানে এসে তারা নীরবেই বসবাস করতে থাকে।

সমস্যার শুরু হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়। বিহারীরা যে নিজেদের সাচ্চা মুসলমান আর পশ্চিম পাকিস্তানি মনে করে, তা প্রকাশ পায় তখনই। সে সময় তারা ভাষা আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় বাঙালিদের সঙ্গে বিবাদ-বিসম্বাদেও জড়াতে থাকে তারা। আর এই বিভেদ চরম রূপ নেয় ’৭০ সালের নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলেও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। এ কারণে বাঙালিরা সংগঠিত হতে থাকে। এরই মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণের পর তারা পাকিস্তানিদের প্রতিরোধের জন্য তীর-ধনুক বল্লম, প্রভৃতি দেশীয় অস্ত্র তৈরি করতে থাকে। এদিকে প্রায় প্রতিদিনই উস্কানি দিতে থাকে বিহারীরা। পেছন থেকে তাদের উৎসাহ, শক্তি ও মদদ যোগায় সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার একটু উত্তরে দেখা যাচ্ছে স্মৃতিসৌধ। যেখানে ট্রেন থেকে ৪৩৭ জন বাঙ্গালীকে নামিয়ে হত্যা করে বিহারীরা।
বিহারীদের উস্কানিমূলক আচরণে অতীষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বাঙালিরা সংগঠিত হতে থাকে। ৭১ সালের ২৩ মার্চ শহরের চারপাশ থেকে বিহারীদের ঘিরে ধরে তারা। কিন্তু বিহারীরা যে ভেতরে ভেতরে এতোটা সশস্ত্র আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল, তা কেউই টের পায়নি। রাত ১০টার পরেই শুরু হয়ে যায় বিহারীদের হামলা। রেলওয়ে কলোনীতে রাতেই প্রচুর মানুষকে হত্যা করে তারা। জীবন বাঁচাতে অনেক বাঙালি পালিয়ে শহরের আশেপাশে গ্রামগুলোতে আশ্রয় নেন।

২৪ মার্চ ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এমপিএ (মেম্বার অব প্রভিনশিয়াল অ্যাসেম্বলি) ডা. জিকরুল হককে। এসব ঘটনায় ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্র-শিক্ষক-জনতা। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) বাঙালি সদস্য, আনসার ও পুলিশের সমন্বয়ে বিহারীদের ওপর পাল্টা আঘাত হানার জন্য জনতা একজোট হয় ৫ এপ্রিল। কিন্তু শহরের প্রবেশপথগুলোতে পাক আর্মির অবস্থানের কারণে সফল হয়নি সে পরিকল্পনা।
তপন কুমার দাস। মুক্তিযুদ্ধের সময় যার পরিবারের ১১ সদস্যকে বিরাহীরা হত্যা করে।
উপজেলার সোনাখুলী গ্রামের জিকরুল হক ওই পরিকল্পনায় নেতৃত্বদানকারীদের একজন। পাক আর্মি তাদের পরিকল্পনার কথা বুঝতে পেরে ১৮ এপ্রিল শহরের আশেপাশের সকল গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।  কোনো উপায়ান্তর না দেখে অগত্যা সশস্ত্র যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন জিকরুল হকরা। সে মোতাবেক ১৯ এপ্রিল বন্ধুদের নিয়ে জলপাইগুড়ির হিমকুমার চলে যান তিনি।

সেখানে ছিলেন এমএনএ মুকতার, আফসার আলীসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। কিছুদিন ওখানেই অবস্থান নেওয়ার পর জুনের দিকে জলপাইগুড়ির মুজিব ক্যাম্পে চলে যান তারা। এরপর ২৯ দিনের গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডার হয়ে হিমকুমার ক্যাম্পে হয়ে চিলাহাটিতে আসেন। ১৪ আগস্ট সৈয়দপুরে প্রথম আট্যাক করেন। বিহারীদের সহায়তায় এটি তখন হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি। সুবিধা করতে না পেরে পিছু হটেন গেরিলারা।
মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলী।
সৈয়দপুরে সে সময় ৪০ হাজার বিহারীর বসবাস ছিল। এদের মধ্যে অন্তত ১৫ হাজার প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ছিল। যারা সরাসরি অত্যাচার, নিপীড়ন, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও হত্যা করতো। এছাড়া মহিলা, শিশু সকলেই ছিল পাকিবাহিনীর সহায়তাকারী।

২৩ মার্চ যখন হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল বিহারীরা, সেদিন রেলওয়ে কলোনিতেই লুকিয়ে ছিলেন কুষ্টিয়ার নুরুজ্জামান জোয়ারদার। রেলওয়ের প্রকৌশলী হিসেবে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কাজ করতেন। সেদিন তার বসকেও মেরে ফেলে বিরাহীরা, যিনি তাকে বাড়ি চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কোনো রকম প্রাণে বেঁচে ২৪ মার্চই কুষ্টিয়া চলে যান তিনি।
যুদ্ধের সময় ডেল্টা কোম্পানীর কমান্ডার জিকরুল হক
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারীরাই ছিল সৈয়দপুরের প্রকৃত রাজাকার। এজাহার বিহারী, নঈম গুণ্ডা, রুস্তম গুণ্ডা, সামসউদ্দীন খান, এজাহার, ইবরার, গুলজার ভাতৃত্রয়, কাইয়ুম মুন্সী ছিল সবচেয়ে কুখ্যাত।

মে মাসের ২৮ বা ২৯ তারিখে কাইয়ুম মুন্সী তপন কুমার দাসদের বাড়িতে আসেন। সেটা ছিল মারোয়ারিপাড়া। মুন্সী তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে যে, যেহেতু তারা হিন্দু, তাই তাদের ভারত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এজন্য তার সঙ্গে যেতে হবে। একথা শুনে সবাই রওনা হয়। কিন্তু তাদের নিয়ে রাখা হয় শহরের উত্তর পাশে আইয়ুর কলোনিতে। যেটা ছিল একটি আবাসন প্রকল্প। বিহারিদের পুনর্বাসনের জন্য যা সামরিক সরকার বানিয়েছিল।
রেলওয়ের প্রকৌশলী মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান। ২৩ মার্চ রাতে তিনি সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনীতে বিহারীদের তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করেছেন।
জার্মান নাৎসী বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মতই ৬ ফুট বাই ৬ ফুট ঘরে ৮-১০ জন করে রাখা হয়। ১৫ দিন সেখানে রাখা হয়েছিল তপনদের। সে সময় প্রতিদিন এসে তাদের নির্যাদন করতো পাঞ্জাবি ও বিহারীরা। আর কার বাড়ি কোথায়, ঘরের কোথায় সিন্ধুক, আলমারির চাবি কোথায়, ব্যাংকে কত টাকা আছে ইত্যাদি জানতে চাইতো। ব্ল্যাঙ্ক চেক এনে সই করিয়ে নিত। এভাবেই চলতো লুটপাট।

হঠাৎ একদিন বলা হলো, ‘তোমাদের আজই ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হবে। স্টেশনে চলো।’ সকলকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে চার কমপার্টমেন্টের একটি গাড়ির দুটোতে মহিলা আর দুটোতে পুরুষদের নিয়ে ট্রেন ছাড়ল। তবে তার গতি ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারের বেশি হবে না। কেমন যেন থমথমে পরিবেশ। তারা বুঝতে পারেন ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এক সময় সকলেই কান্না শুরু করে দিলেন।
প্রাদেশিক আইন পরিষদ সদস্য শহীদ ডা. জিকরুল হকের ছেলে আজিজুর রহমান।
সেদিন ছিল ১৩ জুন। রেলওয়ে কারখানার সীমা পেরিয়ে গোলাহাটি ব্রিজের এলাকায় গেলেই রেলগাড়ি থেমে যায়। সেখানে ধারালো অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বিহারীরা। ট্রেন থামতেই একজন একজন করে ধরেছে, আর নিয়ে গিয়ে কতল করা হচ্ছে। এভাবে একে একে ৪৩৭ জনকে নৃংশসভাবে হত্যা করা হয় সেদিন। আর যারা নারী ছিল, তাদের প্রথমে ধর্ষণ করে পরে হত্যা করা হয়েছে। রেলগাড়ির জানালায় সেফটি রড না থাকায় সেদিন লাফ দিয়ে কোনোমতে পালিয়ে বেঁচে ছিলেন তপন আর তার ভাই। কিন্তু রেহাই পায়নি তাদের পরিবারের মোট ১১ জন। তবে এই ৪৩৭ জনের মধ্যে বাঙালি মুসলমান পরিবারেরও অনেকে ছিলেন। যুদ্ধ শেষে এলাকাবাসীদের সাথে নিয়ে গোলাহাটি থেকে ১৫ বস্তা হাড় উদ্ধার করেছিলেন তপন।

সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টকে সেন্টার করে শহরের চারপাশে বিহারী-পাঞ্জাবিরা এক শক্তবলয় তৈরি করে। যা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে প্রচুর শক্তি প্রয়োগ করতে হয় মিত্রবাহিনীকেও। যে কারণে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হলেও সৈয়দপুর শত্রু মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর।
মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান বীর প্রতীক
পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সৈয়দপুরের নাম নিউ বিহার হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর দেশের অন্যান্য স্থান থেকেও বিহারীরা এখানে এসে হত্যাকাণ্ড চালাতো। পরবর্তী সমরেয় পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলে জীবন বাঁচাতে দেশের সব আনাচে কানাচে থেকে আসতে থাকে বিহারীরা। এ কারণে ডিসেম্বরের শেষে বিহারীদের ভিড়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটার পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তবে জেনেভা কনভেশনের কারণে ভারতীয় আর্মি এদের কাউকে মারতে দেয়নি। ফলে অনেকেই পালিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এদের অনেকে আবার চলেও আসে।

সৈয়দপুরে ৪০ হাজার বিহারীর অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার যুদ্ধাপরাধী বলে স্বীকৃত। অথচ এখানে যুদ্ধপরাধীর কোনো তালিকা আজও তৈরি হয়নি। এছাড়া রাজাকারেরও কোনো তালিকা তৈরি হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কোনো কমিটিই এটি করতে পারেনি। আর এর পেছনের কারণ হচ্ছে স্থানীয় নেতাদের ভোটের রাজনীতি।
বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলছেন মুক্তিযোদ্ধারা
কেননা, বিহারীরা যাকে ভোট দেবে তিনিই হবেন বিজয়ী। অর্থাৎ এ এলাকায় রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের ভোটার বানানো হয়েছে, যাদের সংখ্যা এখন বেশি। এজন্য কোনো নেতাই এখানকার রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধীর নামে তালিকা হোক চাননা। শুধু তাই নয়, বিহারীরা এখন এতো প্রভাবশালী যে, তাদের নাম নিতেও মুক্তিযোদ্ধারা কুণ্ঠাবোধ করেন।

সহযোগিতায়:

যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
বীর প্রতীক মতিউর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলী, নির্যাতনের শিকার তপন কুমার দাস, ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডার জিকরুল হক।


আরও পড়ুন:
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন


বাংলাদেশ সময়: ০৭৪৯ ঘণ্টা ১৫, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

গোবিন্দগঞ্জে নদীতে গোসল করতে নেমে কলেজছাত্রের মৃত্যু
মা মরক্কান বাবা পর্তুগিজ, কার পক্ষে ছেলে?
৬ প্যাথলজিস্টের অভাবে দিনে ৩০ লাখ টাকা হাতছাড়া!
বাগেরহাটে ৩ শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
সিঙ্গাইরে পিকআপ-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১