Alexa

খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে-ছবি: কাশেম হারুন

পঞ্চগড়ের দশমাইল সীমান্তের এপারে ভারতের চাউলহাটি। দশমাইল থেকেই একটি রাস্তা চাউলহাটি সীমান্ত হয়ে একেবারে জলপাইগুড়ি জেলা সদর পর্যন্ত গেছে। ১৯৭১ সালে এই চাউলহাটি থেকেই পূর্ব দিকে রাস্তার দু’পাশে ছিল শরণার্থী শিবির।

জালপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ: পঞ্চগড়ের দশমাইল সীমান্তের এপারে ভারতের চাউলহাটি। দশমাইল থেকেই একটি রাস্তা চাউলহাটি সীমান্ত হয়ে একেবারে জলপাইগুড়ি জেলা সদর পর্যন্ত গেছে। ১৯৭১ সালে এই চাউলহাটি থেকেই পূর্ব দিকে রাস্তার দু’পাশে ছিল শরণার্থী শিবির।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে হয়েছিল প্রচুর বৃষ্টিপাত। ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে কষ্টের কোনো সীমা ছিল না। ভারত সরকারের তরফ থেকে পরিবারপ্রতি একটি করে ত্রিপল দেওয়া হয়েছিল। যা তাঁবুর মতো করেই টানিয়ে থাকতেন শরণার্থীরা।
 
এক তাঁবুর নিচেই চলত রান্না, খাওয়া, ঘুম। আবার তাঁবুর একপাশে মলত্যাগের জায়গা রাখতেন শরণার্থীরা। রান্না ও খাওয়ার পানির যোগান হতো পাশের কোনো ডোবা বা নালা থেকে। এতো মানুষ এসেছিল যে, ফাঁকা জায়গা ছিল না বললেই চলে।
 
দিনের পর দিন ভারত সরকারের দেওয়া আতপ চালের জাউ আর ডাল খেতে হয়েছে তাদের। সব্জি কেনার টাকা কই! স্থানীয়রাও যে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করবেন সে সামর্থ্য তাদেরও ছিল না।
 
দীর্ঘদিন ধরে একই খাবার আর দুষিত পানি পান করতে করতে শিবিরগুলোতে শুরু হয়ে যায় ডায়রিয়ার মহামারী। কোনো পরিবারের শুধু স্বামী বেঁচে আছে তো স্ত্রী-কন্যা-পুত্র একদিনেই মারা গেছে। কোনো পরিবারের আবার স্ত্রী বেঁচে গেলেন তো স্বামী-সন্তান সব মারা গেছেন।
 
কোনো উপায় ছিল না দুর্দশাকবলিত দেশছাড়া এসব অসহায়, বিপন্ন মানুষের। ওই যে তাঁবুতে রান্না-খাওয়া-ঘুম চলতো, সে তাঁবুর নিচেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখতে হয়েছে স্বজনের মৃতদেহ। পুরো জলপাইগুড়িতে ৩১টির মতো শরণার্থী শিবির ছিল। সবক’টিতে একই রকম অবর্ণনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সে সময়।
 
চাউলহাটি বর্ডারের কাছেই গড়িয়াপাড়ায় আইনাল হকের বাড়ি। কেউ মারা গেলে তিনি মরদেহ পুঁতে রাখতে সহায়তা করতেন। তার মতে, ‘এখনো বর্ডার রোডের সাত মাইল জুড়ে রাস্তার দুপাশ খুঁড়লেই মৃতদের হাড়-হাড়্ড়ি পাওয়া যাবে।’
 
ওপারে বাংলাদেশের দশমাইল এলাকায় ভারতীয় আর্মি ও মুক্তিবাহিনীর শক্তিশালী ডিফেন্স ছিল। ফলে দশমাইল থেকে উত্তর-পশ্চিমের তেঁতুলিয়া, বাংলাবান্ধা ছিল মুক্ত অঞ্চল। দশমাইল থেকে চাউলহাটি পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা। এ রাস্তা ধরেই ভারতীয় আর্মির লোকেরা অস্ত্র, ট্যাংক, গোলা-বারুদ নিয়ে ঢুকে পড়তেন।
 
দশমাইলের একটু সামনেই ভারত থেকে নেমে আসা চাওয়াই নদীর ব্রিজ। তার ওপারে অমরখানাতে ব্যাপক শক্তি নিয়োজিত করেছিল পাকসেনারা। তাদের ছোড়া মর্টার শেল এসে পড়ত চাউলহাটির বিভিন্ন পাড়ায়। এতে অনেক সময় সাধারণ মানুষের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হতো।
 
অক্টোবরের দিকে ভারতীয় আর্মিও বেশি করে শক্তি নিয়োজিত করা শুরু করে। সে সময় গড়িয়াপাড়া বর্ডার এলাকায় বাঙ্কার খোঁড়ার কাজ করতেন নাসির উদ্দীন। তিনি বাঙ্কার খোঁড়ার সময় একদিন তার একটু দুরেই এসে পড়েছিল পাকসেনাদের মর্টার শেল। সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন ভারতের এই নাগরিক।
 
ভারতীয় আর্মি সে সময় চাউহাটি বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) ছাড়াও ফকিরপাড়া, গড়িয়াপাড়াতে শক্তিশালী মর্টার স্থাপন করে। সেখান থেকেই পাকসেনাদের অমরখানা ঘাঁটিতে শেল ছুড়তেন তারা। আর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কভারিং ফায়ারের সুযোগ নিয়ে গেরিলা আক্রমণ চালাতেন।
 
ভারতীয় আর্মি ছিল নিরাপত্তার ব্যাপারে খুবই কঠোর। নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় নাগরিকদেরও কাছাকাছি আসতে দিতেন না তারা। তারা যাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করতেন, তারাই কেবল শরণার্থী শিবির, ক্যাম্প বা আর্মির অবস্থানের কাছাকাছি আসতে পারতেন।
 
একদিন আইনাল হককেও মর্টারের কাছাকাছি আসার অপরাধে শাস্তি পেতে হয়েছিল। তাকে এজন্য মারধর করেন আর্মির লোকেরা। তার বাড়ির পাশেই ছিল ভারতীয় বাহিনীর মর্টার। সে মর্টারের পাল্লা ছিল অনেক বেশি।
 
আইনাল হকের ছিল গরুর গাড়ি। সে সময় নিজের গাড়িতে করেই মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ডারে নামিয়ে দিতেন তিনি। দেশ স্বাধীন হলেও তিনি শরণার্থীদের গরুর গাড়ি করে রংপুর, দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে নামিয়ে দিয়ে আসতেন।
 
নভেম্বরের যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যায়। সে সময় দশমাইল এলাকায় প্রচুর ট্যাঙ্ক পাঠায় ভারতীয় আর্মি। অমর খানায় এতো শক্তি নিয়োগ করেছিল পাকবাহিনী, যে প্রতিদিন যুদ্ধ হয়েছে। ভারতের আর্মির সহায়তায় ব্যাপক যুদ্ধের মাধ্যমে ২০ নভেম্বর অমরখানা দখল করে নেয় মুক্তিবাহিনী। এরপর তারা পঞ্চগড়ের জগদল ক্যাম্পে ডিফেন্স করে। ২১, ২২, ২৩ নভেম্বর টানা যুদ্ধ করে ২৪ নভেম্বর দখলে নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। সেখান থেকে পঞ্চগড়ে শহরের ভেতর প্রবেশ করে ২৬, ২৭ ও ২৮ নভেম্বর পাকসেনাদের পুরোপুরি পরাস্ত করে।
 
পাকসেনারা এরই মধ্যে করতোয়া নদীর এপারে বর্তমানে যেটা তেঁতুলিয়া মোড়, সেখানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ওখানে পরে বধ্যভূমি করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করে স্থানীয় রাজাকাররা। যাদের মধ্যে বিহারীরা ছিল দুর্ধর্ষ। ২৯ নভেম্বর স্বাধীন হয় পঞ্চগড়। পাকিবাহিনী তখন দিনাজপুর হয়ে রংপুর ক্যান্টমেন্ট এবং সৈয়দপুর ক্যান্টমেন্টের দিকে পিছু হটে।
 
যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
চাউলহাটির গড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা আইনাল হক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারী চাকরিজীবী নাসির উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম।
 
সহযোগিতায়:

বাংলাদেশ সময়: ০৭১৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৫,  ২০১৬
ইইউডি/জেএম

 

আবারো বিতর্কে জড়ালেন কঙ্গনা
সাত মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন, মামলা হয়নি
সুদের পাওনা টাকার জের ধরেই গৌরাঙ্গকে হত্যা করা হয়
ঈদের আগে জামিন মিললো ৪২ শিক্ষার্থীর
বাজপেয়ীর মৃত্যুতে ত্রিপুরায় মাসব্যাপী কর্মসূচি