Alexa

আখাউড়ার যুদ্ধ ও ত্রিপুরার মানুষের বিরল ত্যাগ!

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও-দীপু মালাকার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা।

আগরতলা, ত্রিপুরা, ভারত: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা। বাংলাদেশ-লাগোয়া ভারতের এই অঙ্গরাজ্যটি নিজেদের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। ট্রেনিং ক্যাম্প, মেডিকেল ক্যাম্প, শরণার্থী ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয় বাহিনীর ব্যস্ততার শহর হয়ে উঠেছিল আগরতলা।

আগরতলার জনগণ খোঁজখবর রাখতেন বাংলাদেশের। তাই এপ্রিলের শুরুর দিকে বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে আগরতলার মানুষও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই হাজারে হাজারে শরণার্থী আসতে শুরু করে। শিশু-কিশোর থেকে নানা বয়সের অসহায় লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ নিজেদের ভিটেমাটি, সহায়সম্পদ ছেড়ে বাঁচার জন্য এক কাপড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসতে থাকেন ত্রিপুরায়।

তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ১৬ লক্ষ। অথচ যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে এখানে আসা শরণার্থীদের সংখ্যা হয় ১৭ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো হিসাবমতে, শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লক্ষ। আশ্রয়শিবির ছাড়াও সীমান্তঘেঁষা সব বাড়িতেই শরণার্থীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল।নভেম্বরের দিকে আগরতলা সীমান্তেও বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা।

ত্রিপুরায় তখন পাকা বাড়ির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। ভারতের অনুন্নত রাজ্যগুলোর একটি এই ত্রিপুরা। নিজেদের মাটির ঘরেই এখানকার মানুষ শরণার্থীদের জায়গা করে দেন। আশ্রিতদের সঙ্গে নিজেদের খাবার হাসিমুখে ভাগ করে খেতেন তারা। একবেলা ভাত খেলে আরেক বেলা রুটি খেয়ে কাটাতেন। তখন ত্রিপুরায় বিদ্যুৎ ছিল না। রাতের বেলা আলো জ্বালানোর জন্য হ্যারিকেন আর কুপিবাতিই ছিল সম্বল। কিছুদিনের মধ্যে কেরোসিনেরও সংকট শুরু হয়। বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসা ত্রিপুরার পেট্রল পাম্পগুলোতে বিনা পয়সায় জ্বালানি ভরা হতো। কারণ ভারতে তখন পাকিস্তানি মুদ্রা চলতো না। আবার বাংলাদেশেরও ছিল না নিজস্ব কোনো মুদ্রা।

এভাবেই ত্রিপুরাবাসী নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াবার।তাদের সঙ্গে সুখদু:খ ভাগ করে নেবার।

নভেম্বরের দিকে আগরতলা সীমান্তেও বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। হানাদারদের শক্তিশালী টাইগার ফোর্স মরিয়া হয়ে ওঠে আখাউড়ায়। সেখান থেকে ছোড়া মর্টারের শেল এসে আগরতলার ঘরবাড়িতে পড়তে থাকে। নিরীহ ভারতীয়রাও শহীদ হন। পঙ্গু ও আহত হন। হানাদারদের শেলের আঘাতে আগরতলা বিমানবন্দরেই মারা যান তিন ভারতীয়।আশ্রয়শিবির ছাড়াও সীমান্তঘেঁষা সব বাড়িতেই শরণার্থীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল।

সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধবিমানের হামলা বাড়তে থাকে। ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী বাড়িগুলোর মানুষকে সেনাবাহিনী পরিখা (ট্রেঞ্চ) খননের কৌশল শিখিয়ে দেয়। কোনোটি ইংরেজি এল আকারের, কোনটি এম বা এন আকারের। এমনভাবে ট্রেঞ্চগুলো খোঁড়া হয় যেন বিমানের সার্চ লাইটে ধরা না পড়ে এবং নিরাপদ থাকে।

নভেম্বরের শেষ দিকে পাকিস্তানিদের বিমান হামলা বেড়ে যেতে থাকে। পাকিস্তানি হানাদার বিমানকে তাড়া করে পালাতে বাধ্য করতো ভারতীয় যুদ্ধবিমান। বিমান হামলা শুরু হলে এক ধরনের সাইরেন বাজানো হতো আর তখনই এখানকার মানুষজন ট্রেঞ্চে ঢুকে যেতেন। আবার বিমান হামলা শেষ হলে বাজানো হতো আরেক ধরনের সাইরেন। তখন ট্রেঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসতেন তারা। শেষ দিকে যুদ্ধ এতোই উত্তাল রুপ নেয় যে, কয়েকদিনের শুকনো খাবার নিয়ে ট্রেঞ্চে প্রবেশ করতেন তারা। সীমান্তে দিন-রাত ট্যাংকসহ ভারী যুদ্ধযানের অবিরাম আসা যাওয়া চলতেই থাকতো।ত্রিপুরাবাসী নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াবার।

গেরিলাযুদ্ধের শুরু থেকেই আগরতলা হাসপাতালে চলতো আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে দিনরাত শ্রম দিতেন এখানকার চিকিৎসক, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবীরা। এখানকার হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচারসহ সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হতো আহত মুক্তিযোদ্ধাদের। ডা. সুজিত, ডা. রথীন দত্তের মতো চিকিৎসকরা সাধ্যাতীত আন্তরিকতা দিয়ে চিকিৎসা করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের।অনেক মুক্তিযোদ্ধা পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই শত্রু হননের জন্য, নিজ ভূমি মুক্ত করার জন্য  রণাঙ্গনে ফিরে যেতেন। তাদের এই উদ্দীপনা, দেশকে মুক্ত করার এই অদম্য স্পৃহা ও মনোবল ত্রিপুরাবাসীর ভালোবাসা ও সমীহ আদায় করতো। সম্ভবত গোটা ভারতবর্ষে বাংলাদেশিদের জন্য ত্রিপুরাবাসীর ভালোবাসা ও ত্যাগ ছিল সবচেয়ে বেশি। ভালোবাসায়, ত্যাগে ও সহমর্মিতায় ত্রিপুরার মানুষ গড়েছিলেন তুলনাবিরল নজির।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দুই ও তিন নং সেক্টরে যৌথ অপারেশন চলছিল মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধে শহীদ হন ভারতীয় জাঠ রেজিমেন্টের ১০ থেকে ১৫ জন সৈন্য। হেলিকপ্টারে করে আগরতলা পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তাদের মরদেহ নিয়ে আসা হয়। আবারও গোলাবারুদ মজুদ করে উড়ে যায় হেলিকপ্টার। সেদিন আগরতলার সর্বস্তরের মানুষ এই শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছিলেন।

জাঠ রেজিমেন্টে ছিলেন ভারতের পাঞ্জাব ও হরিয়ানা প্রদেশের বাসিন্দা সৈন্যরা। প্রচণ্ড সাহসী হয় এই দুই অঞ্চলের সৈন্যরা। কথিত আছে, গুলি সবসময় জাঠ রেজিমেন্টের সৈন্যদের বুকে লাগে, পিঠে নয়।রজগোপাল চৌধুরীর ছেলে মনোজ কুমার চৌধুরী।

পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারেরা বাংলাদেশে নারীদের ওপর চালায় অবর্ণনীয়  নির্যাতন। যেসব নারী পাকি সেনাদের যৌন পৈশাচিকতার শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়তেন, তাদের গর্ভের ভ্রুণ নিষ্ক্রিয় করা, শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা দেবার কাজ করতেন ডা. নীহারকণা, সুনন্দা বন্দোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা দত্তের মতো ত্রিপুরার মহিয়সী নারীরা।

ডিসেম্বরের শুরুর দিকেই পরাজয় যে অনিবার্য তা পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বর্বর পাকি বাহিনী সেকারণে হয়ে ওঠে ভয়ানক প্রতিশোধকামী। তারা ভারতের অন্তত একটি শহরকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলাকেই মোক্ষম ও সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয় তারা। এরই অংশ হিসেবে আগরতলা বিমানঘাঁটি ধ্বংস করাটাকেই প্রথম অপরিহার্য করণীয় বলে ভেবে নেয় পাকিস্তানিরা।

৪ ডিসেম্বর আগরতলা বিমানবন্দরে হামলার পরিকল্পনা করে পাকিস্তানি বাহিণী। ত্রিপুরা পুলিশের কোড অব সিগন্যালসের অফিসার ছিলেন রজগোপাল চৌধুরী। ২ ডিসেম্বরই ওয়ারলেস মারফত তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। অবগত করেন সেনাবাহিনীকে। ফলে ভারতীয় বাহিনী প্রি-অ্যাম্পটিভ স্ট্রাইক বা আগাম আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। ৩ ডিসেম্বরই আখাউড়া সীমান্তে পাকবাহিনীর ওপর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়।মুক্তিযুদ্ধ ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বেঁধে দিয়েছে ভালোবাসার এক চির, অচ্ছেদ্য রাখীবন্ধন

সীমানা পার হয়ে দুই বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদারদের ওপর। ভারতীয় বিমানবাহিনীও যোগ দেয় তাতে। ৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী মরণপণ যুদ্ধে পাকি হানাদারমুক্ত হয় আখাউড়া। অনেক ভারতীয় সৈন্য জীবিত ফিরতে পারেননি আর। অন্যদিকে নিজ মাতৃভূমিতেই শহীদ হন বহু মুক্তিযোদ্ধা। অনেক প্রাণের, অনেক ত্যাগের বিনিময়েই আখাউড়া থেকে পাকি হানাদারদের হটানো সম্ভব হয়।

আখাউড়া হানাদারমুক্ত হওয়ার পর সীমান্তের ওপারে আগরতলাসহ ত্রিপুরায় বিভিন্ন এলাকায় আনন্দমিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন অসংখ্য মানুষ। তাদের হাতে হাতে শোভা পাচ্ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সেই পতাকার লাল বৃত্তের মাঝে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। আগরতলাবাসীর বহু ত্যাগ, বহু অশ্রুবিসর্জন, সুদীর্ঘ সহিষ্ণু প্রতীক্ষা আর মুক্তিবাহিনী-মিত্রবাহিনীর রক্তক্ষয়ী মরণপণ লড়াই শেষে আখাউড়ার আকাশে ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

মুক্তিযুদ্ধ এভাবেই ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বেঁধে দিয়েছে ভালোবাসার এক চির, অচ্ছেদ্য রাখীবন্ধন।মানবেতিহাসে যার তুলনা বিরল।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন:
** ‘ভাই, মেরে লাশকো ভারতমে ভেজ দেনা!’
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন


বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬
এমএন/জেএম

ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:

রজগোপাল চৌধুরীর ছেলে মনোজ কুমার চৌধুরী। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। মনোজ বর্তমানে আগরতলার ইউকো ব্যাংকের কামাল চৌমুহনী ব্রাঞ্চের স্পেশাল অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কর্মরত।

আবারো বিতর্কে জড়ালেন কঙ্গনা
সাত মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন, মামলা হয়নি
সুদের পাওনা টাকার জের ধরেই গৌরাঙ্গকে হত্যা করা হয়
ঈদের আগে জামিন মিললো ৪২ শিক্ষার্থীর
বাজপেয়ীর মৃত্যুতে ত্রিপুরায় মাসব্যাপী কর্মসূচি