Alexa

তিন ঘণ্টার আক্রমণেই বিজয়পুর ক্যাম্প ছাড়ে পাকবাহিনী

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ভারতের মেঘালয়ের বাঘমারা এলাকা। এখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে আসা শরণাথীদের ক্যাম্প ছিল- ছবি: কাশেম হারুণ

নেত্রকোণার দূর্গাপুরে ভারত-সীমান্ত ঘেঁষে বিজয়পুরের অবস্থান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানেই শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকসেনারা। সীমান্তের এপারেই মেঘালয়ের বাঘমারা এলাকা। যেখানে হাজার হাজার মানুষে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এখানে ডিফেন্স ছিল মুক্তিবাহিনীরও।

বাঘমারা, মেঘালয়: নেত্রকোণার দূর্গাপুরে ভারত-সীমান্ত ঘেঁষে বিজয়পুরের অবস্থান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানেই শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকসেনারা। সীমান্তের এপারেই মেঘালয়ের বাঘমারা এলাকা। যেখানে হাজার হাজার মানুষে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এখানে ডিফেন্স ছিল মুক্তিবাহিনীরও।

বিজয়পুর ক্যাম্প থেকে পাকসেনারা গোলা ছুড়লে তাতে অনেকসময় মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ বাঙালিরা আহত হতেন। বাদ যেতেন না স্থানীয় গারো আদিবাসীরাও। পাকবাহিনীর কয়েকদিন এমন আক্রমণের পর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কভারিং ফায়ার দিতে এগিয়ে আসে। বিএসএফ-এর ক্যাম্প ছিল বাঘামারা বাজারের একটু উত্তরেই, জাকসু গ্রামে।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহের শুরুতেই সিদ্ধান্ত হয় পাকসেনাদের বিজয়পুর থেকে হটিয়ে দেওয়া হবে। সে মোতাবেক এক রাতে চলে প্রস্তুতি। বিএসএফ এর সঙ্গে ভারতীয় আর্মির আর্টিলারি বাহিনীর একটি দল মর্টার সেট করে সুবিধামতন। স্থানীয় খ্রিষ্টান মিশনের উপরে বেশ কয়েকটি মর্টার বসানো হয়। আর মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেন সীমান্ত ঘেঁষে।
 
সবকিছু ঠিকঠাক করে ভোর ৫টার দিকে শুরু হয় অতর্কিত হামলা। সকাল আটটা পর্যন্ত অনবরত চলতে থাকে আক্রমণ। ভারতীয় আর্টিলারী বাহিনীর মুহুর্মুহু মর্টার শেল নিক্ষেপ আর গেরিলাদের গুলির তোড়ে তছনছ হয়ে যায় পাকসেনাদের বিজয়পুর ক্যাম্প। পাল্টা আক্রমণে চেষ্টা করেও তারা আর কুলিয়ে উঠতে পারেনি। মাত্র তিন ঘণ্টার আক্রমণেই পিছু হটে পাকবাহিনী। এরপর যুদ্ধের পুরোটা সময় আর কোনোদিন তারা বাঘমারার দিকে এগোয়নি।
এই তোড়া পাহাড়ের পাদদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত / ছবি: কাশেম হারুণ এ ঘটনার পরে পাকসেনারা শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে নেত্রকোণার বিরিশিরি হাইস্কুলে। সেখানে স্কুলমাঠেই তারা মর্টার বসিয়ে শেল ছুড়তো বাঘমারায়। মর্টারের গোলা পড়ে অনেক মানুষ মারা যায়, অনেকে আহত হয়। ফলে জুনের দিকে শরণার্থী শিবির গড়ে তোলা হয় মালিকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায়। তবে নৌকায় করে সোমেশ্বরী নদী হয়ে এতো মানুষ আসতো যে, শিবিরে তাদের আর জায়গা হতো না। বাধ্য হয়ে অনেকেই পাহাড়ের ভেতর আশ্রয় নিতেন।

অল্প জায়গায় এতো মানুষের অবস্থানের কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা দেয় কলেরা ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। অনেক মানুষ মারা তাতে যায়। পুরো বাঘামারা এলাকায় এতো শরণার্থী ছিল যে, মৃত মানুষকে কবর দেওয়ার জায়গাও পাওয়া যেত না। মাটিতে, নদীর চরে বালুতে পুঁতে রাখতে হতো মরদেহ। দেখা যেত কিছুক্ষণ পরেই এসে মৃতদেহ কুকুরে তুলে নিয়ে গেছে।সব মিলিয়ে ভয়াবহ, দুর্বিষহ দিন কাটাতে হয়েছে উদ্বাস্তু বাঙালিদের।
 
শরণার্থী শিবির ছাড়াও অনেকেই আশ্রয় নিতেন স্থানীয়দের বাড়ীতে। রঞ্জিত তালুকদারের বাড়ি মালিকোণায়। যুদ্ধের সময় বাঘমারা স্কুলে নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। তাদের বাড়িতে উঠেছিল দূর্গাপুরের শিবগঞ্জের ডাক্তার কালী কুমার দাস। তারা পুরো নয় মাস জুড়েই রঞ্জিতদের বাড়িতে ছিলেন। তবে পাকসেনাদের মর্টার হামলা বেড়ে গেলে, বাঘমারা এলাকা ছেড়ে পাহাড়ের আরো ভেতরে শিবির স্থানান্তর করা হয়।
এই তোড়া পাহাড়ের পাদদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত / ছবি: কাশেম হারুণ এসব শিবির থেকেই আবার মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট করা হতো। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হতো তোরা পাহাড়ের প্রশিক্ষণ শিবিরে। প্রশিক্ষণ শিবিরের অবস্থান ছিল তোরার দোবাসীপাড়ার বিএসএফ ক্যাম্প থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তরে। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বাঘমারাতেই আসতেন গেরিলা যোদ্ধারা। অনেককে আবার ডালু ও  মহেন্দ্রগঞ্জেও পাঠানো হতো।
 
শরণার্থী শিবিরে দূর্গাপুরের মোহাম্মদ জালাল এমপি, মোহাম্মদ খসরু ও  মধুসহ আওয়ামী লীগের নেতারা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতেন। তারাই যু্দ্ধে যাওয়ার অণুপ্রেরণা দিতেন।
রণজিৎ তালুকদার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন / ছবি: কাশেম হারুণ শিবিরে এসে অনেকে আবার ব্যবসাও করেছেন। যারা বাংলাদেশ থেকে গরু-ছাগল বিক্রি করে কিছু টাকা আনতে পেরেছিলেন, তারা স্থানীয়দের সাথে মিলে ব্যবসা করতেন। অনেকেই তোরা থেকে দ্রব্য সামগ্রী কিনে এনে বিক্রি করতেন। নেত্রকোণার এক লোক যুদ্ধের পরপরই বাঘমারায় একটা হোটেল খুলেছিলেন। যার নাম ছিল জনতা হোটেল। সেটা পরে তিনি বিক্রি করে দিলে মায়া হোটেল নামে সেই জনতা হোটেল এখনো টিকে আছে।
 
তবে যাদের টাকার অভাব ছিল তাদের দুর্দশার কোনো শেষ ছিল না। ভারত সহায়তা করার পর অল্প দিনেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। শিবির থেকে যার যার বাড়ি চলে যেতে হয়। এতে অনেকেই মাথায়-আকাশ-ভেঙ্গে-পড়ার মতো অবস্থা পড়েন। নিজ বাড়ির কিছু্ তো অবশিষ্ট নেই। দেশে গিয়ে কি করবেন, কি খাবেন- এসব নিয়েই সাধারণ মানুষের চিন্তার শেষ ছিল না। উপায়ান্তর না থাকায় অনেকেই শিশু সন্তানকে বিক্রি করেও চলে গেছেন। সেসব শিশু এখন বড় হয়ে বাঘামারাতেই বিয়ে করে সংসার পেতেছেন।
 
যারা তথ্য ও বর্ণনা দিয়েছেন:
বাঘমারা বাজারের বাঙালি ব্যবসায়ী বাপ্পী সাহা, রঞ্জিত তালুকদার ও মোহাম্মদ খলিল।


সহযোগিতায়:

বাংলাদেশ সময়: ০৮৩৬ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬
ইইউডি/জেএম/এসআরএস

 

পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানবাহনের দীর্ঘলাইন
কারাগারে ঈদ উৎসবে মেতে থাকবে ১০ হাজার বন্দী
ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন করমজল
কনার ঈদ গানের ডানায়
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু