Alexa

সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কে বাংকারে ঢুকে পড়তেন সাহেবগঞ্জবাসী

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সাহেবগঞ্জ। এখানে ছিল শরণার্থীদের আশ্রয় শিবির। ছবি: কাশেম হারুন

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দিন হবে। সেদিন সন্ধ্যার পরপরই বিকট শব্দে কানে তালা লাগার দশা হয় সাহেবগঞ্জবাসীর।

কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ: ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দিন হবে। সেদিন সন্ধ্যার পরপরই বিকট শব্দে কানে তালা লাগার দশা হয় সাহেবগঞ্জবাসীর। পাকসেনারা সেদিন উপর্যুপুরি মর্টার শেল ছুড়তে থাকে। তাদের অবস্থান ছিল সীমান্তের ওপারে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারির বাগভাণ্ডার এলাকায়।

 

সাহেবগঞ্জ হচ্ছে ভারতের কোচবিহার জেলার বাংলাদেশ-সীমান্তবর্তী একটি এলাকা। এখানকার বামনহাট এলাকা ছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প। সেখান থেকেই ভারতীয় আর্মির লোকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের নানা রকম সহযোগিতা যোগাতেন। একারণে ক্ষিপ্ত পাকসেনারা প্রায়শই সাহেবগঞ্জ এলাকায় মর্টারের গোলা ছুড়তো।
 
সেদিনের হামলায় সীমান্তবর্তী গ্রাম কালমাটির খাসপাড়ায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। মোদক বাড়িতেই মারা যান ৫ পাঁচ জন। এদের মধ্যে ৪ জন ছিলেন খগেন মোদক, তার ভাই দীনেশ মোদক, বোন চনক মোদক ও তার স্ত্রী। এরপরই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করতে থাকে।মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে অকৃত্রিম সহযোগিতা করেন মৃণাল চক্রবর্তী। ছবি: কাশেম হারুন
 
ভীত সন্ত্রস্ত সাহেবগঞ্জবাসীর যাওয়ার জায়গাও তেমন ছিল না। কেননা, প্রতিটি খোলা জায়গায় অবস্থান নিয়েছিল বাঙালি শরণার্থীরা। শুধু তাই নয়, অনেক এলাকাবাসীর বাড়িতেও অনেকে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে স্থানীয়দের প্রায় সকল বাড়িতেই বাংকার খোঁড়া হয়।
 
মোদক বাড়িতে হতাহতের পর সন্ধ্যা হলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতেন সাহেবগঞ্জবাসী। সকলেই নিজ নিজ বাংকারে অবস্থান নিয়ে রাত কাটাতেন। সেখানে ছিল না কোনো আলোর ব্যবস্থা, ঘুমানোর ব্যবস্থা। বাংকার না বলে বরং সেটাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠ বলাই ভাল। সেই প্রকোষ্ঠের মধ্যে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্কদেরও আশ্রয় নিতে হয়েছে। এভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সন্ধ্যা হলেই বাংকারে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাতেন সাহেবগঞ্জবাসী।
 
আব্দুল সামাদ শেখের বাড়ি খাসপাড়ায় মোদক বাড়ির পাশেই। সেদিনের কথা মনে হলে আজও তার গা শিউরে ওঠে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখনো সেই ভয়াল দিনের কথা মনে করতে তিনি আতঙ্কে কুঁকড়ে যান।
 
সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশ বর্ডার থেকে মৌমাছির ঝাঁকের মত গুলি আসতো। পুমপুম, ভুম ভুম, ধ্রিম নানা রকম শব্দ হতো। গুলির কারণে রাস্তা দিয়ে কেউ হাঁটতেন না। ক্ষেতের ভেতর দিয়ে কখনো হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো মাথা নিচু করে চলাফেলা করতেন স্থানীয়রা।সাহেবগঞ্জ। এখানে ছিল শরণার্থীদের আশ্রয় শিবির। ছবি: কাশেম হারুন
 
আব্দুল সামাদ শেখের বাড়িতে ১০-১২জন শরণার্থীর একটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। মোদক বাড়িতে গোলা এসে পড়ার  পরের দিন তার ভাই বাংকার খুঁড়ে পরিবারের সবাইকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানকার অন্ধকার গুমোট আবহাওয়ার দম বন্ধ হয়ে এলে চিৎকার করে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। এরপর তারা বাংকারে না থেকে বাড়ির অদূরে কলার ক্ষেতে রাত কাটাতেন।
 
কখনো কখনো মুক্তিযোদ্ধারা সামাদদের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। তবে একদিনের বেশি থাকতেন না। সে সময় বিস্কুট, চানাচুর, খাইয়ে তাদের আপ্যায়ন করতেন সামাদ।
 
কোচবিহারের দিনহাটা থানার মধ্যে পড়েছে সাহেবগঞ্জ। তবে শুধু সাহেবগঞ্জেই নয়, পুরো দিনহাটাতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে উঠেছিল শরণার্থী শিবির।
 
শরণার্থী শিবির ঘিরে আবার গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু ইয়ুথ সেন্টার। এসবের নেতৃত্বে ছিলেন ভুরুঙ্গামারীর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।সাহেবগঞ্জ। এখানে ছিল শরণার্থীদের আশ্রয় শিবির। ছবি: কাশেম হারুন
 
বামুন হাট ইয়ুথ সেন্টারের নেতৃত্বে ছিলেন কুড়িগ্রামের ডা. মজিবুর রহমান, সাহেবগঞ্জের নেতৃত্বে আব্দুস সাত্তার, খোঁচা বাড়ির নেতৃত্বে আব্দুল গফুর মণ্ডল ও ঝাওকুটির নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল আজিজ।
 
তারাই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য শরণার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। এরপর রিক্রুট করে জলপাইগুড়ির মেটলি থানাধীন ‘মুরতি ক্যাম্প’-এ (পরে যেটার নামকরণ করা হয় মুজিব ক্যাম্প’) পাঠানো হতো। যেটা ছিল ভারতীয় আর্মির ক্যাম্প। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে আবার দিনহাটাতেই পাঠানো হতো।
 
দিনহাটা থানায় বৃহত্তর রংপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার শরণার্থীরা বেশি ছিলেন। এদের অনেকে যুদ্ধের পর ভারতেই রয়ে গেছেন। যাদের বেশিরভাই ছিলেন হতদরিদ্র। দেশ স্বাধীন হলেও দেশে তো কিছু নেই। তাই জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনেকেই কোচবিহারে থেকে গিয়ে বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন।
 
দিনহাটা থেকে সাহেবগঞ্জে বাজার পর্যন্ত যে সড়কটি গেছে, সেটি একেবারে সোজা পূর্ব দিকে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকেছে। বৃটিশ আমলে এ সড়কপথেই হতো সব যোগাযোগ। সড়কটি সোজা ভুরুঙ্গামারি বাজার হয়ে আরো পূর্বে সোনাহাটি হয়ে ভারতের আসাম ঢুকে পড়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ রুট ধরেই মিত্রবাহিনীর ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে ১৩ নভেম্বর। ব্যাপক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৪ নভেম্বর মুক্ত হয় ভুরুঙ্গামারী।
 
দিনহাটাতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স-বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীরও ক্যাম্প ছিল। তারা স্বতন্ত্রভাবে পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ চালাতেন। এ অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর নেতা ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা আখতারুজ্জামান মণ্ডল।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন
** মুক্তিযোদ্ধা হয়েও দেশ থেকে ‘বিতাড়িত’ শ্রীবরদীর খলিল
** লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা
** খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে
** ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’
** হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা

** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

 
বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটার হাটার সাহেবগঞ্জের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মৃণাল চক্রবর্তী ও ভুক্তভোগী আব্দুল সামাদ শেখ।

 

আমানতের সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে পর্তুগাল, গোল করেছেন রোনালদো
পত্নীতলায় গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
মেহেরপুরে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার
‘বেস্ট নেভার রেস্ট’ স্লোগানে ঘাম ঝরাচ্ছে জার্মানরা