Alexa

সিপিএমের সমর্থনে যুদ্ধে নামেন ভারতীয়রাও

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর যশোর রোড। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বেনাপোল হয়ে এ রোড দিয়েই শরণার্থীরা ভারতে প্রবেশ করে।ছবি: কাশেম হারুণ

অক্টোবরের দিকে উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁও সীমান্তের আশেপাশে পাকসেনাদের আক্রমণে একদিনেই ভারতের ৭’শ সেনা নিহত হন। এরপর থেকেই স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) বা সিপিএম এর কর্মীরা স্থানীয়দের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

উত্তর চব্বিশ পরগনা পশ্চিমবঙ্গ: অক্টোবরের দিকে উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁও সীমান্তের আশেপাশে পাকসেনাদের আক্রমণে একদিনেই ভারতের ৭’শ সেনা নিহত হন। এরপর থেকেই স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) বা সিপিএম এর কর্মীরা স্থানীয়দের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

বনগাঁও সীমান্তের ওপারেই বাংলাদেশের যশোর জেলার বেনাপোল। মার্চের দিকেই এ সীমান্তে ভারতীয় আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকতে তাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। তাই মাঝেমাঝেই মুক্তিবাহিনীর গাইডের দেখানো পথ ধরে অতর্কিত হামলা চালাতো তারা।


অক্টোবরের দিকে একদিন মুক্তিবাহিনীর গাইড পরিচয়ে পাকসেনাদের গুপ্তচর, মূলত রাজাকার ভারতীয় আর্মির লোকদের বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে যায়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। তারা অ্যামবুশে পড়েন। বয়রা বর্ডারের কাছে সেদিন রাতেই ভারতের ৭শ সেনা নিহত হন।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর যশোর রোড। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বেনাপোল হয়ে এ রোড দিয়েই শরণার্থীরা ভারতে প্রবেশ করে।ছবি: কাশেম হারুণ
এ ঘটনার পর ভারতীয় আর্মির মনোবলে চিড় ধরে। মুক্তিবাহিনীর লোকদের নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয়। তারা মুক্তিবাহিনীর লোকদের আর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তখন থেকে মু্ক্তিবাহিনীর গাইডের পরিবর্তে সিপিএমকর্মী ও স্থানীয়দের সহায়তা নিতে থাকেন তারা। ভারতীয় আর্মির সঙ্গে অস্ত্র হাতে তারাও পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। সিপিএম যুদ্ধের শুরু থেকেই নানাভাবে সহায়তা করে আসছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধের আগে বেশ ক’বার বনগাঁওয়ে এসেছিলেন। সে সময় তিনি সিপিএম নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। সে থেকেই আওয়ামী লীগ ও তার আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ছিল সিপিএমের। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায়ই তাজউদ্দীন আহমদও বনগাঁওয়ে আসতেন। এছাড়া কাদের সিদ্দিকীসহ অনেক নেতাই এখানে সিপিএম নেতাদের সাথে বৈঠক করতেন স্থানীয় হাইস্কুলে।
ভারতের নদীয়া জেলার কল্যাণী। এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির ছিল। ছবি: কাশেম হারুণ
যুদ্ধের সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজের ছাত্রনেতারা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তখনকার সিপিএম-এর তরুণ নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, অনীল বিশ্বাসরা সব সময় বনগাঁওয়ে আসতেন। তাদের নেতৃত্বে সিপিএমকর্মীরা যুদ্ধে সহায়তা করেছেন। শরণার্থী শিবিরে খাবারের ব্যবস্থাসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সব ধরনের কাজই তারা করতেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মাধ্যমিকে পড়তেন বনগাঁওয়ের সনাতন চৌধুরী। তার বয়স ছিল ১৫ কিংবা ১৬ বছর। ভারতীয় আর্মি যশোর, খুলনায় অপারেশনে গেলে তিনি ও তার বন্ধুরাও তাদের সঙ্গী হতেন। বিকাল ৫টায় রওনা হয়ে ৬টায় সীমান্ত পার হতেন। রাতে বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়ে আবার রাত সাড়ে ৪টায় চলে আসতেন।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর সনাতন চৌধুরী। বাংলাদেশের পক্ষে ভারতীয় সেনাদের সাথে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন করেন।ছবি: কাশেম হারুণ
সনাতন চৌধুরীরা যশোর বারো বাজারে বহুবার গেছেন। সেখানে ছিল মুসলীম লীগের ঘাঁটি। রাজাকারদের বড় আস্তানা ছিল ওখানে। ৭-৮দিন অপারেশন চালিয়ে তারা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন। ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষের নদের ধারে শিবমন্দির ছিল। ওখানেও ছিল পাকসেনাদের ক্যাম্প।

বনগাঁওয়ের যে বর্ডার-রোডটি বাংলাদেশের ভেতর প্রবেশ করেছে, সেটাই ইতিহাসখ্যাত যশোর রোড নামে পরিচিত। ওপারের বাংলাদেশে এই রোডের দু’পাশেই পাকসেনাদের হত্যাযজ্ঞ চলতো। পড়ে থাকত লাশের ওপর লাশ। সেগুলো কখনো কাক, কখনো কুকুর-শেয়ালে খেয়েছে। আর যারা পালিয়ে এসেছিলেন তারা যশোর রোডের বনগাঁও অংশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই রোডটি পশ্চিমে চলে গেছে কোলকাতা, নদিয়াসহ বিভিন্ন রাজ্যে।
কলকাতার সল্টলেক এলাকা। এখানে শরণার্থী শিবির ছিল। ছবি: কাশেম হারুণ
লাখ লাখ উদ্বাস্তু বাঙালি বর্ডার পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, কল্যাণী, বারাসাত, দমদম, সল্টলেক সহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেন। কল্যাণী ও কোলকাতা শহরের অদূরে সল্টলেকে সে সময় গড়ে উঠেছিল বড় বড় শরণার্থী শিবির। পুরো পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক শিবিরে প্রায় ৪৮ লাখ শরণার্থী মুক্তিযুদ্ধের সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন।

মার্চের শেষের দিকেই দূর পাল্লার কামান থেকে ওপারে পাকসেনাদের বর্ডারঘেঁষা ক্যাম্পগুলোতে শেল ছোড়ে ভারতীয় আর্মি। মার্চ মাসের দুই এক দিন থাকতেই ব্যাপক হামলা চালায় তারা। দুইটা বড় কামান ছিল। রাখাল দাস বিদ্যাপীঠ বলে একটা হাইস্কুল আছে, ওর মাঠের কোণায়। আরেকটা ছিল গোবরাপুরের কোণায়। ভারী কামানের গোলায় পাকসেনারা মার্চেই বাংলাদেশের বর্ডার ছেড়ে দেয়। ঘাঁটি গাড়ে আরো পূবে।
কলকাতার সল্টলেক এলাকা। এখানে শরণার্থী শিবির ছিল। ছবি: কাশেম হারুণ
পাকসেনারা এরপর আর বর্ডারের কাছে আসতে পারেনি। এর ফলে এপার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় আর্মি ধীরে ধীরে মার্চ করতে থাকে। এভাবে যেতে যেতে যশোর ক্যান্টমেন্ট দখল করে নেয় তারা  নভেম্বরের দিকে। এরপর তারা ঢাকার দিকে মার্চ করে।
 
যশোর ক্যান্টনমেন্ট অনেকটা ফোর্ট উইলিয়ামের দূর্গের মতো। ওখানে ভারতীয় আর্মির রাজপুত রেজিমেন্টের এক মেজর সনাতন চৌধুরীদের নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্যান্টনমেন্টে মেয়েছেলেদের ব্যাপক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছিল। ১৫ গাড়ি মেয়েদের বের করে নেওয়া হয়েছে। পুরো এলাকায় ছিল বিশ্রি গন্ধ। মেয়েদের চুড়ি-শাখা, জামা-কাপড় পাওয়া গেছে অনেক।
 
যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বাসিন্দা সনাতন চৌধুরী ও হরিদাস পাল। ভারতীয় রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি সনাতন চৌধুরী বর্তমানে স্থানীয় মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সহযোগিতায়:
আরও পড়ুন...
** ইছামতির পাড় থেকে সাতক্ষীরায় যুদ্ধ
** মুরতি নদীর তীরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ
** তিন ঘণ্টার আক্রমণেই বিজয়পুর ক্যাম্প ছাড়ে পাকবাহিনী
** ইন্দিরা গান্ধী নিজেই ছিলেন প্রেরণা​
** সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কে বাংকারে ঢুকে পড়তেন সাহেবগঞ্জবাসী
** মুক্তিযোদ্ধা হয়েও দেশ থেকে ‘বিতাড়িত’ শ্রীবরদীর খলিল
** লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা
** খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে
** ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’
** হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানবাহনের দীর্ঘলাইন
কারাগারে ঈদ উৎসবে মেতে থাকবে ১০ হাজার বন্দী
ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন করমজল
কনার ঈদ গানের ডানায়
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু